প্রেমের লাল ছোয়া পর্ব ৩

প্রেমের লাল ছোয়া

প্রেমের লাল ছোয়া

কীরে ভাই? মুখটা এমন চিলে চ্যাপ্টা করে রেখেছিস কেন বে? মনে হচ্ছে কেও মুখের উপর দিয়ে ট্রাক উঠিয়ে দিয়েছে! ছ্যাঁকা ট্যাকা খেলি নাকি? " এরকম গুরুতর একটা মুহুর্তে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড নামের কলঙ্ক আকাশের কথা শুনে তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো নিশান। চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঝরছে। আকাশকে নিশানের ছায়া বললেও বোধহয় ভুল হবে না। সেই স্কুল লাইফ থেকে তারা একসাথেই আছে। এমনকি ভাগ্যক্রমে একই ভার্সিটিতে লেখাপড়াও করেছে। আকাশের থেকে নিশানকে কেও ভালো ভাবে বুঝতে পারে না, এমনকি তার মা খাদিজা তালুকদারও নয়। একটু বাঁদর হলেও নিশান আকাশকে বন্ধু হিসেবে অনেক ভালোবাসে। আকাশও অবশ্য কম নয়, নিশানের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। এইতো নিশানের এক ডাকেই এই রাত দশটায় চায়ের দোকানে এসে হাজির হয়েছে সে। তবে এখানে আসার পর থেকেই আকাশ মুখ কুঁচকে বসে আছে। নিশান তাকে এখানে কেনো এই রাতে ডাকল, এখনো কোনো কারণ খুঁজে পেল না সে। তাই বাধ্য হয়েই মুখ ফঁসকে কথাটা বলে দিল, আর নিশান অগ্নিচক্ষু নিক্ষেপ করল। আকাশ তার দিকে তাকিয়ে বিন্দুমাত্র ভয় পেল না, বরং ঠোঁটের কোণে চিরচেনা হাসিটা টেনে বলল, "এই দৃষ্টি দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করো না বন্ধু। আমি ভয় পাই না। এই দৃষ্টি দিয়ে তুমি আমায় ভয় না দেখিয়ে, এই দৃষ্টিই প্রেম নিবেদনে নিক্ষেপ করে মেয়ে পটাও। জীবনে কাজে দেবে।" নিশান ঠান্ডা গলায় বলল, "আকাশ..মুখ বন্ধ রাখ। আই সোয়ার, এমন জায়গায় ঘুষি মারব যে ডক্টরকেও দেখাতে পারবিনা। তোর ফালতু কথা সহ্য করার মুডে নেই আমি।" আকাশ কাঁধ ঝাঁকাল, " তা তো বুঝতেই পারছি। আচ্ছা, তুই যা, চুপচাপ একটা সিগারেট ধরা, অথবা চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়া, তারপর বলিস কী হয়েছে। নাহলে তোর এই গুপ্ত ঘাতকের চোখ দেখে মনে হচ্ছে, আমি যে তোর বেস্ট ফ্রেন্ড, সেটা ভুলে গুলি চালিয়ে দিবি। আমার আবার তোর বিয়ে দেখা পর্যন্ত বাঁচার খুব শখ!" নিশান ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলল। এই ছেলের সাথে কখনোই সিরিয়াস কথা বলা যায় না। আকাশ এবার কাঁচের কাপে ধোঁয়া উঠা চায়ে চুমুক দিয়ে বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে, " দোস্ত, সত্যি সত্যি ছ্যাঁকা খেয়েছিস নাকি?" আকাশের কথায় নিশান ধীরগতিতে তার দিকে তাকাল। চোখেমুখে যেনো এক সমুদ্র গম্ভীরতা। দোকানের কাঁচের গ্লাসে চায়ের ধোঁয়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর তার মধ্যেই নিশান একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল আকাশের দিকে। গম্ভীর স্বরে দাঁত খিঁচিয়ে নিশান বলে উঠলো, "আমি তোর মতো ফালতু নই, যে ছ্যাঁকা খেয়ে বসে থাকবো। টাইম নেই।" আকাশ তখনও কৌতূহলী ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। দু’হাতে চায়ের কাপ মুঠোবন্দি করে হাসল, "তাহলে মুখটা এমন হয়ে আছে কেন? আন্টির হাতে ধরা পড়ে গেছিস নাকি? বাড়ির অবস্থার জন্য তো তুই কদিন ধরেই টেনশনে আছিস, এবার কি অন্য কিছু?" নিশান চুপ করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। আকাশ এবার একটু নরম স্বরে বলল, " বল না ভাই, কী হয়েছে? বাড়ির পরিস্থিতি কি আরও খারাপ?" নিশান এবার মুখ শক্ত করে কাপে এক চুমুক দিলো। তারপর গলায় গাম্ভীর্য এনে বলল, " শৈলীকে ওরা বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে, আকাশ। আরেহ ভাই, পড়াশোনাটা শেষ হোক! কিন্তু না.....এত কীসের তাড়া বুঝিনা। এখন আমি যদি কিছু না করি, ওকে এখান থেকে বের না করি, তাহলে খুব শিগগিরই একটা বড় কিছু ঘটে যাবে। বাবাও তো মায়ের জন্য মুখ বন্ধ রেখেছে।" আকাশ এবার সত্যিই সিরিয়াস হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে বলল, "মানে? আবার কী হয়েছে?" নিশান একবার চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আমার আর মামনির অনুপস্থিতিতে সুযোগ পেয়ে আবারো পাত্রপক্ষ ডাকা হয়েছিল। আমি যদি সময়মতো বাড়ি না ফিরতাম, তাহলে আজই হয়তো...." নিশানের অসম্পূর্ন কথাটায় আকাশ অন্যমনস্ক মনে বিড়বিড় করে দুঃখী মনে আওড়ালো, " তাহলে আজই আমি আমার হবু মিষ্টি ভাবি টা হারাতাম..!" কথাটা শুনতে পেল না নিশান। শুনলে তো আকাশের পটল তোলা কেও আটকাতে পারত না। আকাশ চায়ের পাত্র নামিয়ে রাখল, এবার তার চোখেও উত্তেজনার ঝলক। "শুধু পাত্রপক্ষ এসেছিল দেখেই তুই এমন করে বসে আছিস? এটা তো আগেও হয়েছে, তখন তোর এমন অবস্থা দেখিনি। এইবার কি নতুন কিছু হয়েছে?" নিশান চোখ নামিয়ে আনমনে চায়ের পাত্রে আঙুল ঘুরাতে লাগল। তারপর গভীর স্বরে বলল, "আমি বুঝতে পারছি না, আকাশ। শৈলীর কষ্ট দেখে কেন জানি না এবার আর সহ্য হচ্ছে না। আগেও সহ্য করতে পারতাম না, মায়ের জন্য চুপ থাকতাম। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে...কিছু একটা করা দরকার। শুধু শুধু ওকে এত অত্যাচার করার মানে টা কী। ভালো লাগছেনা এত অশান্তি। " আকাশ ঠোঁট চেপে হাসল, মাথা একটু কাত করল, তারপর বলল, "ওহ! তাহলে এবার ব্যাপারটা এখানে গড়িয়েছে?" নিশান এক ঝটকায় তাকাল আকাশের দিকে, চোখেমুখে বিরক্তি। "মানে?" আকাশ ধীরেসুস্থে বলল, "মানে হলো, তুই ওর কষ্ট সহ্য করতে পারিস না, কিন্তু এইবার ব্যাপারটা একটু বেশি তীব্র মনে হচ্ছে। কারণটা তো বুঝতেই পারছিস, তাই না?" নিশান কিছু না বলে শুধু ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "তুই যদি এত বেশি বোকা বোকা কথা বলতে চাস, তাহলে চলে যেতে পারিস!" আকাশ হেসে বলল, "বোকা বোকা কথা বলছি নাকি বাস্তবটাই বলছি, সেটা ভেবে দেখ বন্ধু। " নিশান ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে এক লম্বা শ্বাস ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "শৈলীকে এবার সত্যি সত্যি বাড়ি থেকে বের করতে হবে, আকাশ। না হলে ওর জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। অন্য কোথাও ওর জন্য থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।" আকাশ এবার হাসি বন্ধ করে দিল। কয়েক মুহূর্ত নিশানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, "তুই তাহলে সিরিয়াসলি ভাবছিস এটা?" নিশান দৃঢ় গলায় বলল, "ভাবতে বাধ্য হচ্ছি।" আকাশ আঁতকে উঠলো। টেবিলের উপর কনুই ঠেকিয়ে অস্থিরতার স্বরে বলল, " ভাই, কী বলছিস এসব? বের করতে হবে মানে? না না, এটা সম্ভব না। এটা বলিস না। আমি এটা হতেই দেবো না। ও মাই গড! এটা হতে দেয়া যাবেই না। ও চলে গেলে তোর কী হবে?" তৎক্ষনাৎ নিশানের অগ্নি ঝরা চোখের দৃষ্টি পড়লো আকাশের উপর। আবারো মুখ ফঁসকে আন্সপেক্টেড কথা বলে দেওয়া বেচারা আকাশ মুখ ঝুলিয়ে মেকি হাসলো। নিশানের চোখে এখনো ঝিলিক দিয়ে উঠল প্রচণ্ড ক্ষোভের আগুন। তার গাঢ়, শীতল দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, যেন এক গহীন সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর ঝড়। আকাশের দিকে তাকিয়ে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, মুখের রেখাগুলো কঠোর হয়ে গেল। নিশান ধীর কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, " হোয়াট ডু ইউ মিন আকাশ? আবার বল তো।" আকাশ যদি পাগল হতো বা হিরো আলম হতো তাহলে বোধহয় সত্যিই আরেকবার কথাটা বলতো। কিন্তু এখন তার আর কোনো সাহস নেই। নিশানের শক্ত হাতের মার সে যতবার খেয়েছে ততবারই তীব্র ব্যাথা নিয়ে দুদিন বিছানায় পড়ে থাকতে হয়েছে। তাই বুদ্ধিমানের ন্যায় আকাশ মেকি হেসে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, " না মানে...আমি বলতে চাইছিলাম কি...মানে একবার ভেবে দেখ..শৈলী তো তোর সব কাজ করে দেয় ভাই। মানে তুই নিজেও তো জানিস...সকালে তোকে চা দেয়া, কফি দেয়া, তোর ঘর গুছিয়ে দেয়া, তোর সো কোল্ড ফাইল ঠিকঠাক রাখা, তোকে সহ তোর পুরো গুষ্টিকে খাবার বেড়ে দেয়া এমনকি মাঝে মাঝে তোর জামাকাপড়ও তো শৈলীই ধুয়ে গুছিয়ে রেখে দেয়। কত কাজ করে মেয়েটা! কত গুণীই আহা! ও যদি না থাকে, তোর এসব কাজ কে করবে বল?" " বাড়িতে সার্ভেন্ট আছে...!" দাঁত চেপে চোখ রাঙিয়ে গম্ভীর কন্ঠ নিয়ে কথাটা বলল নিশান, যেন আকাশকে নীরব হুমকি দিয়ে দিল। আকাশ আবারো নিজের চলন্ত ঠোঁটের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অক্ষম হলো। মুখ ফঁসকে বাঁকা হেসে বলে উঠলো, " বউয়ের কাজ কি সার্ভেন্ট দিয়ে হয়?" বলেই চোখ বুঁজে দাঁত দিয়ে জ্বিভ কাটলো আকাশ। শেষ! সব শেষ! তার আর রক্ষে নেই। কেনো যে নিজের কথার বাহার সে ধরে রাখতে পারে না, কে জানে। অবশ্য তার কী দোষ! সে তো অনেক খোলা মনের মানুষ। মনে যা আসে সব বলে দেয়। সে কি এই নিশানের মত বোরিং আলুর ভর্তা নাকি! হাহ! চোখ গরম করে তাকিয়ে থাকা নিশান এবার দুহাত মুঠো করে কটমট করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলল আকাশের ওপর। আকাশ আবারো নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে বম ফেটে যাওয়ার আগেই সাফাই গাইতে হাত নাড়িয়ে বলে উঠলো, " না মানে...আমি বলতে চাইছিলাম, বোন, বোন! হেহে! কথাটা হতো, চাচাতো বোনের কাজ কি আর সার্ভেন্ট দিয়ে হয় বল?" " মুখ বন্ধ রাখ আকাশ..." নিশানের কণ্ঠে প্রচণ্ড সংযত রাগ লুকিয়ে, কিন্তু আকাশ ওর প্রতিটি শব্দের মধ্যে একটা গর্জনের স্পন্দন শুনতে পেল। আকাশ গলা খাঁকারি দিয়ে একটু পেছনে সরে বসলো, তারপর নিচু গলায় বলল, "তুই এতটা রেগে যাচ্ছিস কেন, নিশান? আমি তো শুধু তোর জন্য চিন্তা করেই বললাম। আমি তো তোর ভালো চাই।" নিশান এবার আকাশের দিকে এক ঝটকায় তাকাল। গভীর কালো চোখ দুটোয় তীব্র এক ঝলক খেলে গেল। "তুই যদি শৈলীর ব্যাপারে সিরিয়াসলি কিছু না বুঝে থাকিস, তাহলে এই প্রসঙ্গে আমাকে আর একটাও কথা বলবি না।" নিশান ধীরগতিতে চায়ের কাপটা হাতে নিল, কিন্তু আঙুলগুলো এতটাই শক্ত হয়ে ছিল যে কাপের কাঁচ প্রায় ভেঙে যাবে মনে হচ্ছিল। এক মুহূর্ত পরে সে চাপা স্বরে বলে উঠল, "আমি ঠিক করেই ফেলেছি, আকাশ। শৈলী ওই বাড়িতে আর থাকবে না। এবার আমি যা বলবো, তাই হবে। আর ওই মেয়ে যদি বেশি বেশি কথা বলে তবে...." আকাশ আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলতে চাইলো, " তবে তুই নিজেই ওকে বিয়ে.....!" আবারো নিশানের দৃষ্টিতে থামলো আকাশ অসম্পূর্ণ কথাটা কিছুটা মিথ্যে যোগ করে বলল, " মানে তুই ওকে বিয়ে...দিয়ে দিবি। অন্য কারো সাথে। বুঝেছি। তুই ওকে অন্য কারো সাথে বিয়ে দিয়ে ভালো জায়গায় পাঠাবি। বাহ, বাহ। কি সুন্দর চিন্তাধারা। আমি তো তোমার এসি.. আই মিন ফ্যান হয়ে গেলাম বন্ধু।" " ওও আচ্ছা তাইইই?" দাঁত খিঁচিয়ে টেনে টেনে বলল নিশান। আকাশ আবারো বলল, " হ্যাঁ, অবশ্যই। শোনো বন্ধু, বড়লোক ছেলের সাথে দিও, ভালো হবে। সুগার ড্যাডি এনো না আবার। আচ্ছা, আমিও হেল্প করব।" নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আকাশ কলার ঝাঁকিয়ে গর্বের সঙ্গে বলে উঠলো, " বন্ধু, নো টেনশন, নো প্যারা, আমি আকাশ, ঘটকালিতে সবার সেরা! এমন পাত্র খুঁজে আনব যে তুই হিংসায় আর শৈলীকে বিয়েই দিবি না। " আকাশ নিশানের রাগী চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এবার সত্যিই কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। মুখ বন্ধ রেখে সে আরেক কাপ চা অর্ডার করল। নিশান আবারো অন্য দিকে তাকিয়ে চিন্তায় ডুব দিল। কিছুক্ষণ পর চা এলে আকাশ আবারো আঙুল দিয়ে খোঁচা মারল নিশানকে। আসলে চুপচাপ বসে থাকতে তার একদম ভালো লাগে না, তার থেকে নিশানকে জ্বালিয়ে তার আগুনের মতো চোখ দেখেও শান্তি। আকাশের খোঁচাখুঁচি তে নিশান বিরক্তির দৃষ্টি ফেলে ভ্রু উঁচিয়ে বলল, " কী?" আকাশ এবার পায়ের উপর পা উঠিয়ে বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে বলল, "একটা কথা শোন, ভাই। কেবল শৈলীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকলে তো হবে না। ওসব বাদ দে। তোর কথা বল। নিজের অনুভূতির বিষয়ে কিছু বুঝতে পেরেছিস? নাকি এখনো পারিস নি?" নিশান আকাশের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল, যেন ওর কথা পুরোপুরি বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধমকানোর স্বরে কাঁচের গ্লাসের গায়ে আঙুল বোলাতে লাগল। " বা* বুঝতে পেরেছি বা* । অসহ্যকর! কীসের অনুভূতি রে! হুদাই এগুলা রঙচঙ লাগাবি না আকাশ। শৈলী আমার চাচাতো বোন। কীসের বা* এর অনুভূতি থাকবে! আমার অনুভূতি নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছিস কেনো?" আকাশ ঠোঁট চেপে হাসল, চোখ টিপে বলল, "হুদাই রঙচঙ লাগাচ্ছি? তো তোর মুখের এই গম্ভীর ভাবটা কীসের, ভাই? শৈলীর জন্য এত অস্থির হয়ে আছিস কেন? চাচাতো বোন তো অনেকেরই থাকে, সবাই কি এভাবে চিন্তায় পড়ে যায়?" নিশান এবার সত্যিই বিরক্ত হলো। গ্লাসটা টেবিলে রেখে ভ্রু কুঁচকে বলল, "আকাশ, তুই কী বুঝাতে চাস? আমি তোকে বলেছি, যা করছি, সেটা কেবল শৈলীর ভবিষ্যতের জন্য। নট ফর দিস! " আকাশ ঠাণ্ডা গলায় বলল, "হুমম, ভবিষ্যতের জন্যই তো? তাহলে শৈলী যদি সত্যিই অন্য কোথাও ভালো থাকে, অন্য কারও সঙ্গে সুখে থাকে, তোর কিচ্ছু হবে না, তাই তো?" নিশান মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেল। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরল, চোখ সরিয়ে নিল। আকাশ ওর এই নীরবতাই খুঁজছিল। একদম শান্ত গলায় বলল, "দেখ, আমি তোর বন্ধু, শত্রু নই নিশান। তোকে বুঝতে পারি বলেই বলছি, যদি কিছু অনুভব করিস, সেটা অস্বীকার করিস না। কারণ যা সত্যি, তা অস্বীকার করে কেউ কখনো পালাতে পারে না। তুই কিন্তু সত্যি অনেক ডেস্পারেট! আই ক্যান ফিল ইউ ইয়ার!" নিশান এবার সোজা হয়ে বসে গেল। ঠাণ্ডা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাকে এসব নিয়ে ভাবতে বলিস না, আকাশ। বাড়িটার অবস্থা দেখেছিস! আনন্দে ভরে থাকা বাড়িটা এখন প্রতিদিন অশান্তিতে থাকে। আমার জাস্ট বিরক্ত লাগে। অতিরিক্ত ঝামেলা আর করিস না। যা করার, আমি করব। শৈলী ভালো থাকলেই আমার টেনশন শেষ। ব্যস!" আকাশ মাথা নিচু করে হাসল, "ঠিক আছে, দেখি কতদিন এভাবে বাঁচিস!" নিশান এবার খানিক থেমে ঠাণ্ডা গলায় বলল, "আমার অনুভূতি কী, সেটা আমি বুঝে নেব, তোকে বুঝতে হবে না।" আকাশ হেসে মাথা নাড়ল, "ঠিক আছে, ঠিক আছে! তুই বুঝ, আমি দেখি। কিন্তু ভাই, একটা কথা বলে রাখি, এমন কিছু করার চেষ্টা করিস না, যেটা পরে নিজেকেই পোড়াবে।" নিশান কিছু না বলে চায়ে চুমুক দিল, কিন্তু চোখের কোণে একঝলক উদ্বেগ ঠিকই দেখা গেল। আকাশ সেটা ঠিকই ধরে ফেলল। দুষ্টুমি করে আবারো গভীর কন্ঠে বলল, " শৈলী নিজেই যদি অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু চায়? অপ্রত্যাশিত কিছু আবদার করে? তখন?" নিশান এবার এক ঝটকায় আকাশের দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে বলল, "আবার ফালতু কথা বলছিস?" আকাশ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি রেখে বলল, " ফালতু কথা বলছি, নাকি সত্যিটা তোর সামনে তুলে ধরছি, সেটা পরে বুঝবি। আপাতত, যা করার কর। তবে একটা কথা মনে রাখিস, তোর যা অবস্থা, তাতে এর মানে কেবল সহানুভূতি নয়... আরও কিছু থাকে সেখানে।" নিশান আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। সত্যিই খুব বিরক্ত লাগছে তার। পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে টেবিলে রাখল সে, তারপর দ্রুত পায়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। আকাশ বসে বসে মাথা নাড়ল, নিজের মনে বলল, "কঠিন প্রেমে পড়লি রে ভাই, কঠিন প্রেম।" এবার আকাশ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পিছন থেকে একটাই কথা জোরে জোরে নিশানকে শুনিয়ে বলল, " বন্ধু আমার, শেষ কথাটা শুনে যা ভাই, যা থেকে পালাচ্ছিস, সেটাই একদিন তোর সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে সামনে দাঁড়াবে! গরিবের কথা বাসি হলেও ফলে। দেখে নিস। এটা না হলে আমি আকাশ, নিজের নাম পাল্টে পাতাল রেখে দেব।" ~~~~★ ~" তালুকদার নীড় " সূর্যটা ধীরে ধীরে পূর্ব দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে। চারপাশে হালকা কুয়াশা ছড়িয়ে আছে, তার মাঝে তালুকদার নীড়ের বিশাল উঠোনটা স্নিগ্ধ আলোয় ঢেকে গেছে। বাড়ির পুরোনো লোহার গেটটা আজও একটু খোলা রাখা হয়েছে, যেন প্রতিদিনকার মতো সকালবেলা তাজা বাতাস ঢুকতে পারে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে শিউলি আর বেলিফুলের মিশ্র সুবাস। আকাশ তখনও ফিকে নীল, তবে সকালের মিষ্টি আলো ধীরে ধীরে সবুজ পাতাগুলোয় ঝিলিক ফেলছে। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো টুপটাপ করে মাটিতে পড়ছে, মাঝে মাঝে কোনো কোনো পাখি ডেকে উঠছে। তালুকদার বাড়ির পুরোনো মেহগনি গাছের নিচে রাখা কাঠের বেঞ্চিটা শিশিরে ভিজে গেছে, যেন রাতের গভীরতা এখনো ধরে রেখেছে নিজের মাঝে। তালুকদার নীড়ের প্রধান ভবনটি রাজকীয় স্থাপত্যশৈলীর এক নিদর্শন। লাল ইটের প্রাচীর, সাদা রঙের কারুকার্য করা বারান্দা, আর বিশাল কাঠের দরজা, সব মিলিয়ে এক জমিদারী গম্ভীরতা এখনো টিকে আছে এই বাড়ির প্রতিটি কোণে। বাড়ির দোতলায় বেশ কয়েকটি বড় জানালা আছে, যেগুলোতে পুরোনো ধাঁচের খিল দেওয়া। সকালে জানালাগুলো খুলে দিলে হালকা বাতাস ঘরের পর্দাগুলোকে দোলায়। তবে আজকের সকালটা অন্যদিনের মতো নয়। বাড়ির পরিবেশে যেন একধরনের চাপা উত্তেজনা, এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সব কিছুই যেন স্থির হয়ে আছে, অপেক্ষা করছে একটা বড় কিছু ঘটার। শৈলীর ঘরের সামনের বারান্দায় একটা কাক বসে আছে, মাঝে মাঝে ঠোঁট দিয়ে লোহার রেলিংয়ে ঠোকর দিচ্ছে। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, জানালার পর্দাগুলো টানা, যেন ভেতরের কেউ আলো চাইছে না। বাড়ির ভেতর নারীদের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, রান্নাঘর থেকে মশলার গন্ধ আসছে, পুরোনো আমলের ঘড়িটা দোতলার সিঁড়ির পাশে টিকটিক শব্দ করে সময় গুনছে। কিন্তু সব কিছুর মাঝেই যেন একটা চাপা শঙ্কা কাজ করছে। হয়তো আজ কিছু একটা বদলে যাবে, হয়তো কেউ চলে যাবে, কিংবা কেউ নিজের অনুভূতি থেকে আর পালিয়ে থাকতে পারবে না। খাদিজা তালুকদার ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। তার গায়ের পাতলা সুতির শাড়িটা একহাতে ঠিক করতে করতে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন। মুখে এক ধরনের চাপা বিরক্তি, চোখেমুখে এক চিলতে শীতল হাসি, যেন কাউকে খোঁচানোর জন্যই তিনি এখানে এসেছেন। রান্নাঘরের ভেতরে তখন রাশিদা তালুকদার গরম ভাপ ওঠা হাঁড়ির ঢাকনা তুলছিলেন। মসলার গন্ধে রান্নাঘরটা ভরে গেছে, তবে তার কপালে হালকা ভাঁজ স্পষ্ট। গত রাত থেকে শৈলী কিছু না খাওয়ার তিনি দ্রুত রান্না শেষ করছেন। খাদিজা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ চুপচাপ দেখলেন, তারপর মৃদু হেসে বললেন, "আহা! সকাল সকাল এত ব্যস্ততা কেন রে রাশিদা? আজ বুঝি বিশেষ কিছু রান্না হচ্ছে? সার্ভেন্ট দের রেখে একা নিজে রান্না করছিস যে!" রাশিদা চমকে তাকালেন। কিন্তু মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে ঢাকনাটা রেখে বললেন, "সবাই যা খায়, তাই তো রান্না করছি ভাবি। বিশেষ কিছু করতে গেলে তো অনুমতি লাগবে, তাই না?" খাদিজা ভ্রু উঁচু করলেন, তারপর চুলের খোঁপা ঠিক করতে করতে বললেন, "ওমা! অনুমতি? সে কী কথা! ননদ-বউদের আবার অনুমতি লাগে নাকি?" রাশিদা এবার ঢোঁক গিলে হাঁড়ির ভেতর নেড়েচেড়ে দিলেন, যেন কথাগুলো এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু খাদিজা হাল ছাড়ার পাত্রী নন। রান্নাঘরের চৌকাঠে হেলান দিয়ে বললেন, " এভাবে একা একা রান্না না করে নিজের মেয়েগুলোকেও তো একটু শেখাতে পারিস বলা তো যায় না, নাহলে আবার তোর মেয়েরাও তোর মতই এভাবে বাপের বাড়িতে পড়ে থাকবে!" রাশিদার হাত থমকে গেল। হাতা ধরে থাকা আঙুলগুলো শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তুললেন না। হাঁড়ির ভাপ উঠতে থাকল, ঘরের ভেতর গরম মসলার গন্ধ আরও গাঢ় হয়ে উঠল, আর সেই গন্ধের ভেতর খাদিজার কথার শীতল ব্যঙ্গ যেন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে বিঁধতে লাগল। রাশিদা ধীর গতিতে হাঁড়ির ঢাকনা চাপা দিলেন, তারপর চোখ নামিয়ে বললেন, "ভাবি, মেয়েরা বাবার বাড়িতে থাকলে কি খুব দোষের কিছু? এই বাড়িতেও তো অনেকে অনেক বছর ধরেই থাকছে, তারা কি সবাই অন্যের ঘরে গিয়ে সুখে আছে?" খাদিজা চোখ ছোট করে রাশিদার দিকে তাকালেন, কটাক্ষ মিশিয়ে বললেন, "তা তো বটেই! তবে সবাই তো আর নিজের কপালের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে সুখে থাকতে পারে না, তাই না?" রাশিদা এবার মুখ তুলে তাকালেন, তার চোখে সেই শান্ত অথচ ধারালো দৃষ্টি। "কপাল তো আসলে সবারই নিজস্ব হয়, ভাবি। কেউ সেটা গর্বের সঙ্গে বয়ে বেড়ায়, কেউ আবার অন্যের ভাগ্য নিয়ে মাথা ঘামিয়ে নিজের সময় নষ্ট করে।" খাদিজার মুখে হালকা বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। চুলের খোঁপাটা ঠিক করে পল্লবিত হাসি নিয়ে বললেন, " তাহলে সময় নষ্ট না করেই তোর মেয়েদের একটু গাইড করিস। না হলে ভবিষ্যতে ওদের জায়গা ঠিক কোথায় হবে, সেটা কিন্তু সময়ই বলে দেবে!" রাশিদা এবার সত্যি সত্যি হাসলেন, তবে সেই হাসির মধ্যে একটা গোপন তাচ্ছিল্য লুকিয়ে ছিল। " তুমিই তো বলো, ভাবি, সময় সব বলে দেবে। তাই আমিও অপেক্ষা করে দেখি, সময় কাকে কোথায় বসায়!" খাদিজার মুখ শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু মুখে আর কিছু বললেন না। রান্নাঘরের গরম বাতাসের মধ্যে কথাগুলো আরও গরম হয়ে উঠেছিল, কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে রাশিদার কাছে এর জবাব দেওয়ার কিছু ছিল না। তিনি আবার হাঁড়ির ঢাকনা তুললেন, আর খাদিজা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট বাঁকিয়ে ধীর পায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ~~~ উপর তলার করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা শৈলী এতক্ষন ধরে সব শুনেছে। চোখ নামিয়ে রেখেছে মেঝের দিকে, কিন্তু মনের ভেতর যেন প্রচণ্ড ঝড় বইছে। খাদিজা তালুকদারের প্রতিটি কথার আঘাত ঠিক যেন ওর বুকের ভেতর এসে বিঁধছিল। রাশিদা তালুকদার তো এই বাড়িই মেয়ে। সে যদি এমন অবহেলিত হতে পারে, তবে শৈলীকে যে ওরা এখনো মে'রে ফেলেনি, এটাই অনেক। শৈলী দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু গলার কাছে দলা পাকানো কান্নাটা আটকে রাখা গেল না। তার দৃষ্টি নিচের দিকে পড়ে থাকা রান্নাঘরের সাদা আলোয় আটকে গেল। রাশিদা এক হাতে হাঁড়ির ঢাকনা সরিয়ে রেখেছেন, অন্য হাতে কপালের ঘাম মুছছেন। এক মুহূর্তের জন্যও চোখ তুলে তাকাননি, যেন এসব কথায় তার কিছুই যায় আসে না। কিন্তু শৈলী জানে, যায় আসে। খুব ভালো করেই জানে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু গাল বেয়ে নামতে লাগল। ঠোঁট কামড়ে চেপে ধরল শৈলী, কোনো শব্দ যেন বের না হয়। আজ আর চিৎকার করতে ইচ্ছে হলো না, আজ শুধু খুব ক্লান্ত লাগছে। এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি করিডোর তার চেনা, তবু কোথাও যেন একটুও জায়গা নেই ওর। " কাঁদছিস কেনো?" পেছন থেকে আসা খুব পরিচিত সেই কাঙ্খিত কন্ঠস্বর শৈলীকে থমকে দিল। তৎক্ষনাৎ হাত মুঠো হলো তার। এই কন্ঠ যে তার খুব পছন্দের। চোখ খিঁচে চোখে থাকা অবশিষ্ট পানিটুকু ফেলে হাত দিয়ে মুছে ফেলল শৈলী। ধীর গতিতে ফিরে তাকালো নিশানের দিকে। নিশান কেবলই মুখহাত ধুয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু সিঁড়ির কাছে এসে শৈলীকে রেলিংয়ে হাত রেখে নিচের দিকে তাকিয়ে খানিক কাঁপতে দেখে সে বুঝলো হয়তো শৈলী কাঁদছে। তাই সময় নষ্ট না করে এগিয়ে এসেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল তার দিকে। শৈলী প্রতিবারের মতো এবারো নিজের দৃষ্টি সচল রাখতে পারল না। বেহায়ার মতো চলন্ত চোখের মনি উপরনিচ নিশানকে দেখেই ঢোক গিলল। মাথা নিচু করে হাত কঁচলাতে শুরু করল সন্তপর্ণে। নিশানের সুঠাম দেহে এঁটে থাকা কালো শার্ট তাকে বরারবরই মুগ্ধতায় ফেলে দিয়েছে। কিন্তু এই সকাল সকাল সে ফরমাল ড্রেসে কেন? নিশান এক কদম এগিয়ে এসে আবারো শুধালো, " বললি না তো, কাঁদছিলি কেনো?" শৈলী নাক টেনে বলল, " কাঁদছিলাম না নিশান ভাই।" " আমাকে বলদ মনে হয়? " শৈলী দুদিকে মাথা নাড়ালো। বিড়বিড় করে বলল, " আপনার মতো সিংহকে থোরাই না বলদ মনে হবে। " নিশান দুহাত বুকে গুঁজে আবারো বলল, " তোর মতো গাধা মনে হয়? " শৈলী একইভাবে দুদিকে মাথা নাড়ালো, " উহু!" নিশান ঠোঁট বেঁকিয়ে একটা ছোট্ট হাসি দিল, তারপর শৈলীর মুখের দিকে তাকিয়ে আরো একধাপ এগিয়ে গেল। "তবে বল, কেন কাঁদছিলি?" নিশান এবার একটু বেশি সিরিয়াস হয়ে প্রশ্ন করল, তার গম্ভীর মুখে কোনো তিরস্কারের আভাস ছিল না, তবে গভীর দৃষ্টি ছিল যেন সত্যিই কিছু জানতে চায়। শৈলী এক পা পিছিয়ে গিয়ে রেলিংয়ের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, " কিছু না নিশান ভাই। এমনিতেই।" " এমনিতেই? " " হুমম!" উপরনিচ মাথা নেড়ে চোখ নামিয়ে রাখে শৈলী। নিশান এবার এক হাত পকেটে রেখে আরেক হাতের বুড়ো আঙুল নিঃসংকোচে আলতো করে রাখে শৈলীর ভেজা গালে। তার স্পর্শ এতটা কোমল যেন কোনো সদ্যশিশুকে স্পর্শ করছে। নিশান ভ্রুর নিচ থেকে নিঃশব্দে স্লাইড করে কানের কাছে নিয়ে যায় নিজের আঙুল, মুছে যায় ভেজা গালে থাকা চোখের অবশিষ্ট ফোঁটা ফোঁটা পানিটুকু। খানিক কেঁপে উঠলো শৈলী। অনুভব করল, নিশানের আঙুলের স্পর্শ যেন তার হৃদয়ের গভীরে একটা মৃদু জোয়ারের মতো আছড়ে পড়েছে। শরীর কিছুটা অবশ হয়ে আসল, আর হৃদয়ের ধ্বনিও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নিশান দ্রুত হাত সরিয়ে নিল, কিন্তু চোখের মধ্যে অজানা এক অস্থিরতা। শৈলী শুধু চোখ নামিয়ে রাখল, এবং নিশানের প্রস্থানের অপেক্ষা করল, যেন এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটাই থেমে গেছে। নিশান শৈলীর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে কোনো প্রশ্ন ছিল না, তবে গলায় কিছুটা অস্থিরতা ফুটে উঠে, যেন সে নিজেই জানে না কেন এই চুপচাপ পরিবেশে তাকে আরও কিছু করতে হবে। শৈলী অবশেষে মাথা তুলে নিশানের দিকে তাকায়, কিন্তু চোখে চোখ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে তার জন্য। তার দিকে এক পলকও তাকাতে সে এখনো সাহস পাচ্ছে না। নিশান কিছুটা থেমে গিয়ে, শৈলীর চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলল, “শৈলী, কখনও কখনও কিছু অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করা যায় না, বুঝতে পারিস? মনে হয়, কিছু কথাই থাকে যা কেবল সময় ও পরিস্থিতি দিয়েই অনুভব করা যায়, কিন্তু কখনও বলা হয় না।” হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিশান, তারপর নিজের হাত পকেটে ভরে দিল। “তবে, যখন তুই কষ্ট পাস, চোখের পানি ফেলিস, আমি অনুভব করি। তোর আঘাত, তোর যন্ত্রণা, সব কিছু... মাঝে মাঝে মনে হয়, যেন আমি ঠিক কিছু একটা করতে পারতাম। কিন্তু... হয়তো কিছু কিছু জিনিস অজান্তেই ঘটে যায়, আর আমরা কিছুই বদলাতে পারি না।” নিশান কিছু সময় চুপ থেকে, শৈলীর কাছ থেকে চোখ সরিয়ে দূরের দিকে তাকাল। “এটা শুধু আমার বক্তব্য। আমি জানি, একটু জটিল কিছু ঘটছে, কিন্তু... অনেক সময় নিজের মধ্যেই হারিয়ে যেতে হয়।" শৈলী মাথা উঠিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এই মানুষটার এমন কথার মানে সে কখনোই ঠিকঠাক ধরতে পারে না। এত জটিল কথা কি কোনো মানুষও বলতে পারে! কিন্তু শৈলী এও জানে যে এখন এই মানুষটার কাছে কথাগুলোর মানে জানতে চাইলে হেসে উড়িয়ে দেবে নিষ্ঠুর এই পুরুষ। নিশান আরও এক পদক্ষেপ পিছিয়ে গেল, যেন তার নিজের অনুভূতিগুলো আরও একবার নিজের মধ্যে আঁটকানোর চেষ্টা করছে। সে গভীরভাবে শৈলীর দিকে তাকিয়ে আবারো বলল, " তুই কেনো এভাবে জেনেশুনে বিষ পান করতে চাস বলতো?" শৈলী সচকিত দৃষ্টি ফেলে হতবাক হয়ে যায়, " হ্যাঁ? আমি? মানে?" নিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর সময় নিয়ে বাঁকা হেসে বরাবরের মতো মানের উত্তর দিল না, " কিছু না, বাদ দে। কিছু অনুভূতি এতো জটিল হয় যে, কি বলি আর কি করি, তা নিজের কাছেই পরিষ্কার হয় না! তোকে আর কী বোঝাবো? এই মানে'র জবাব আমি নিজেই জানিনা।" শৈলী অবাক চোখে তাকিয়েই রইলো মানুষটার দিকে। এই জটিল মানুষ যে অংকের থেকেও জটিল। এই মানুষটাকে কি কেও কখনো বুঝতে পারবে না! কেউ কি নেই, যে এই মানুষটার জটিলতা বুঝতে পারবে? প্রশ্ন রয়ে যায় শৈলীর কোমল মনে, ❝অংকের জটিলতা তো ক্যালকুলেটর দিয়ে সমাধান করা যায়। কিন্তু নিশান নামক এই পুরুষের জটিলতা কীভাবে সমাধান হবে?❞ নিশান এবার চলে যেতে উদ্যত হয়, শেষ বারের মতো যাওয়ার আগে নরম কন্ঠে বলল, " কখনও কখনও কিছু অনুভূতি প্রকাশ করে দুর্বল হওয়ার চেয়ে, নীরব হয়ে দূর থেকেই অনুভব করাটা অনেক বেশি সস্থি দেয়, শৈলী।"

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url