প্রেমের লাল ছোয়া পর্ব ৪
প্রেমের লাল ছোয়া
বাড়িতে নিশান এবং রাশিদা তালুকদার এর পর যদি কেও বা কারা শৈলীকে নিঃস্বার্থভাবে আপন করে নিতে পারে তারা হলো শৈলীর ফুফাতো দুবোন রিমি এবং মিমি। তারা দুজনই শৈলীকে খুব ভালোবাসে।শীতের বিকেলের মিষ্টি আলোয় তিন বোন গোল হয়ে বসেছে তালুকদার নীড়ের পেছনের বাগানে। চারপাশে ছোট ছোট ফুলের গাছ, সবুজ পাতায় ছাওয়া ঝোপঝাড়, আর একটু দূরে পুরনো আমগাছের ছায়া, সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন ওদের আপন এক শান্তির রাজ্য। প্রতি শুক্রবার বিকেলে এভাবেই একসঙ্গে সময় কাটানো ওদের নিয়ম হয়ে গেছে। রিমি এবং মিমি দুজনই শৈলীর থেকে দু বছরের ছোট, তারা এসএসসি দিয়ে কলেজে এডমিট হয়েছে। প্রতি শুক্রবারের মতো আজও তারা মেতে উঠেছে নানা গল্প নিয়ে। মিমি হাত নেড়ে বলল, "শৈলী আপু, তুমি জানো, আমাদের কলেজে এক স্যার আছেন, তিনি এত কড়া যে পুরো ব্যাচ তাকে ‘হিটলার স্যার’ বলে ডাকে!" রিমি সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠে যোগ করল, " আরে, শুধু হিটলার না, খাটাশ একটা। আর উনি তো আমাদের দিকেই তাকান না, যেন আমরা অক্সিজেন নষ্ট করছি!" শৈলী মুচকি হেসে মাথা নাড়ল, "তোমরা কোনোদিন সিরিয়াস থাকবে? কলেজে ভর্তি হয়েছ মাত্র, অথচ গল্পের শেষ নেই!" মিমি চোখ ছোট করে বলল, "আরে আপু, কলেজ লাইফ মানেই তো মজা! আর তুমিও তো আমাদের সঙ্গে বসে গল্প করছ, তার মানে আমরাও তোমাকে টানতে পারছি, তাই না?" শৈলী হাসল, ওদের এই ছোট ছোট আনন্দগুলো ওর কাছে খুব মূল্যবান। সারাদিনের দমবন্ধ করা পরিবেশের মাঝে এই দুই বোনই যেন তার অক্সিজেন। রাশিদা তালুকদারের পরই তো শৈলীকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে আপন করে নিতে পারে এই দুই বোন--রিমি আর মিমি। মিমি হঠাৎ করেই একটু কৌতুহলী হয়ে বলল, " শৈলী আপু, নিশান ভাই কোথায়? সেই যে সকালে বেরোতে দেখলাম। এখনো কোনো দর্শন পেলাম যে।" শৈলী অন্যমনস্ক হলো। সে কেনো, এই বাড়ির কেওই জানেনা যে এই শুক্রবারেও নিশান কেনো বাড়ি থেকে উধাও হয়ে আছে। সেদিন রাশিদা তালুকদারের কঠোর নির্দেশে নিশান আর শৈলীকে বাড়ি থেকে বের করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। তবে তার তীক্ষ্ণ নজরে বন্দি আছে শৈলী। ভয়টা এখানেই! শৈলী এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মাটির দিকে তাকাল। নিশান কোথায় গেছে, সেটাই তো কেউ জানে না। সকাল থেকে সে নেই, দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এল, তবুও কোনো খোঁজ নেই। এমনটা সচরাচর হয় না। রাশিদা তালুকদারও সকাল থেকে অদ্ভুত রকমের শান্ত, কিন্তু শৈলী জানে এই শান্ত ভাবের আড়ালে নিশ্চয়ই কিছু লুকিয়ে আছে। রিমি কৌতূহলী গলায় বলল, "হুমম, আজকাল নিশান ভাই কেমন যেন... বুঝলি রে মিমি, ওনাকে আমার কিছুটা রহস্যময় মনে হয়! তাই না?" মিমি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, " আরে না, নিশান ভাই তো সবসময়ই সিরিয়াস! তবে আজকাল একটু বেশিই গম্ভীর মনে হয়।" শৈলী মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ্যাঁ, নিশান আসলেই বদলাচ্ছে। কিন্তু কেন? এই বদলানোর পেছনে কোনো কারণ কি আছে? নাকি সে কিছু এমন জানে, যা অন্য কেউ জানে না? তার নিজের ভেতরেও একটা আশঙ্কা দানা বাঁধছে, নিশানের এই অনুপস্থিতি কি কোনো নতুন ঝড়ের ইঙ্গিত? ~~★ সন্ধ্যা নেমে এসেছে তালুকদার নীড়ে। বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিশাল গাছগুলো অন্ধকারে আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে, পাতার ফাঁক গলে আসা হলুদাভ স্ট্রিটলাইটের আলোয় উঠোনটা আবছা ঝলমল করছে। দূরে কোথাও নামাজের আজান ভেসে আসছে, সাথে হালকা শীতল বাতাস বইছে, জানালার পর্দা আলতো দুলে উঠছে বাতাসের স্পর্শে। শৈলী নিজের ঘরের নরম বিছানায় শুয়ে উপন্যাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। হাতের মধ্যে ধরা বইটার গল্প একরকম হলেও, তার ভাবনা যেন অন্য কোনো এক জগতে আটকে আছে। একবার সে বইয়ের লাইন পড়ছে, পর মুহূর্তেই নিজের চিন্তায় হারিয়ে যাচ্ছে। আজ সারাদিনের ঘটনাগুলো যেন ওর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। নিশান সকাল থেকে কোথায়, সেটা নিয়ে তার মনে একটা চাপা উদ্বেগ রয়ে গেছে। যদিও সে নিজেকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করছে, বড় ছেলে, নিশ্চয়ই কোনো জরুরি কাজে বেরিয়েছে। এমনিতেও তো সেই মানুষ নিজের কোনোকিছুর কৈফিয়ত কাওকে দিতে পছন্দ করেন না। তবুও মন থেকে চিন্তাটা সরাতে পারছে না শৈলী। হঠাৎ করেই ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ কানে এলো। কেউ টা কি নিশান? শৈলী অজান্তেই বুকের মাঝে চাপা উত্তেজনা টের পেল। সে বইটা বন্ধ করে পাশে রেখে উঠে বসল, কান পেতে শুনতে লাগল, দরজার বাইরে কে আছে… শৈলী দরজার দিকে তাকিয়েই আছে, কিন্তু ভেতরে আসা ব্যক্তির পরিচয় বুঝতে পেরে দ্রুত উঠে বসে সম্মান জানাল। নিশানের বাবা নাসিরুল তালুকদার তালুকদার নীড়ের কর্তা, শৈলীর বড় আব্বু। গাম্ভীর্য আর দৃঢ়তার এক অপরিহার্য প্রতিমূর্তি। তার চলাফেরা সবসময়ই স্থির ও নিয়ন্ত্রিত, চোখে এক ধরনের গভীরতা, যেন কোনো কিছুই তার দৃষ্টি এড়ায় না। আজও তার পরনে ধোপদুরস্ত সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা, কাঁধে একপাশে রাখা বাদামি রঙের শাল। তিনি ঘরে ঢুকে শৈলীর দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। সেই দৃষ্টিতে কোনো কঠোরতা নেই, বরং অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি, একাধারে স্নেহ, অভিমান, আবার কোথাও যেন শাসনের ছায়া। শৈলী অভ্যস্ত ছিল তার এই চাহনি দেখে নীরব হয়ে যাওয়ায়। "এখনো উপন্যাস পড়ছিস ?" নাসিরুল তালুকদারের কণ্ঠ ভারী, তবুও শৈলী তাতে মৃদু উষ্ণতার আভাস খুঁজে পেল। " জি, বড় আব্বু," মাথা নিচু করে নম্রভাবে বলল শৈলী। নাসিরুল দরজা খানিক চাপিয়ে ধীরে ধীরে বিছানার পাশে রাখা চেয়ারে বসলেন। তারপর শৈলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোর সঙ্গে একটু কথা আছে।" শৈলী মাথা নেড়ে হাঁটু মুড়ে বসল। নাসিরুল তালুকদার এক মুহূর্ত নীরব রইলেন, তারপর যেন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে শৈলীর দিকে তাকালেন। তার গভীর চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক স্নেহ, অনুশোচনা, আর একরাশ অব্যক্ত কথা। তিনি ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে শৈলীর মাথায় রাখলেন, তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, " হাশরের ময়দানে আমায় ক্ষমা করিস..." শৈলী চমকে তাকিয়ে চোখ বড় করলো। নাসিরুল ফের বললেন, "আমি জানি, তুই কষ্ট পাস। তোর প্রতি অনেক অন্যায় হয়, আর আমি... আমি চাইলেও কিছু করতে পারি না।" শৈলী বিস্ময়ে তার বড় আব্বুর দিকে তাকিয়ে রইল। এই শক্তপোক্ত মানুষটা, যিনি পুরো তালুকদার পরিবার সামলান, আজ তার কণ্ঠে স্পষ্ট দুঃখ আর অপরাধবোধ। এমনিতেও শৈলী জানে যে, নাসিরুল তাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু খাদিজা তালুকদারের কঠোর অভিব্যক্তি তাকেও মাঝে মাঝে দমিয়ে দেয়। "আমি কখনো চাইনি তোকে কেউ অবহেলা করুক, এই বাড়িতে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলুক, কিন্তু....." দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নাসিরুল , "সবকিছু তো আমার হাতে নেই।" শৈলী জানে, 'সবকিছু' বলতে তিনি কাকে বোঝাচ্ছেন। এই পরিবারের একচ্ছত্র ক্ষমতা যে খাদিজা তালুকদারের হাতে, তা নতুন কিছু নয়। নাসিরুল তালুকদার এবার শৈলীর কাঁধে হাত রেখে গলা আরও নরম করলেন, "আজ তোর মায়ের জায়গায় যদি আমার বউ থাকত, তাহলে কি এমন হতো রে? আমি জানিনা, আর কতদিন তোকে এসব সহ্য করতে হবে। কিন্তু আমি চাই খুব তাড়াতাড়ি যেন তোর একটা ভবিষ্যৎ তৈরী হয়ে যায়। আমি তোর জন্য কিছু করতে পারি না, এই কষ্ট আমাকেও পোড়ায়। কিন্তু মনে রাখিস, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। অবশ্যই ঠিক হবে।" শৈলীর গলা শুকিয়ে এলো। নাসিরুল তালুকদার তার সাথে খারাপ আচরন না করলেও কখনো এমন কথা বলেনি আগে। সে কিছু বলতে গিয়েও পারল না, শুধু নিঃশব্দে মাথা ঝুঁকিয়ে বড় আব্বুর হাতের স্পর্শ অনুভব করল যেই স্পর্শে ছিল একসঙ্গে না বলা হাজারো স্নেহের আশ্বাস। ~~★ মিমি বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে, চোখেমুখে একরাশ আবেগ। নিশানের ছবিটা সে যতবারই দেখুক, ততবারই একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে তার ভেতর। ফোনের স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে মিমি বলল, "নিশান ভাই, আপনি জানেন না, তাই না? কেউ একজন লুকিয়ে লুকিয়ে আপনাকে ভালোবাসে।" একটা চাপা শ্বাস বেরিয়ে এলো তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে। "কেন জানি না, আপনি যখন গম্ভীর হয়ে থাকেন, তখন আরও বেশি ভালো লাগে। হাসলে তো মনে হয়, পুরো দুনিয়া থমকে গেছে।" মিমি ফিসফিস করে বলল, যেন নিশান শুনতে পেলে বিপদ হয়ে যাবে! সে এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল, তারপর ছবিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বিড়বিড় করল। মিমি একবার ফোনের স্ক্রিনে তাকায়, একবার আয়নায়। চোখ বড় বড় করে নিজের চেহারা দেখল, তারপর নিশানের ছবির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, "আচ্ছা নিশান ভাই, আপনি যদি জানতেন, কেউ একজন আপনাকে লুকিয়ে ভালোবাসে, তাহলে কী করতেন? একবারও আমার দিকে তাকাতেন?" সে গাল ফুলিয়ে একটু ভাবল, তারপর আবার নিজের গালে হাত রেখে বলে উঠল, "উফফ! এইভাবে তাকালে তো হার্টবিট বেড়ে যায়! আপনি কি জানেন, আপনার চেহারায় একটা ক্রাশ খাওয়ানোর মতো ব্যাপার আছে? হুঁহ! একেবারে হ্যান্ডসাম !" হঠাৎ মিমি মুখ বাঁকিয়ে বলল, "কিন্তু না, আপনি তো আমার দিকে তাকাবেনই না! শৈলী আপুকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন, যেন দুনিয়ায় আর কেউ নেই! একবার আমার দিকেও তাকিয়ে দেখুন না, নিশান ভাই, আমি দেখতে কি খুব একটা খারাপ?" খপ করে বালিশটা বুকে জড়িয়ে ধরে উল্টে শুয়ে মিমি বলল, "একদিন ঠিকই তাকাবেন! আমি এমন কিছু করব, এমন কিছু হবো, আপনি বাধ্য হবেন আমাকে দেখতে!" আবার ফোনটা তুলে নিয়ে ছবির ওপর আঙুল ঘুরিয়ে বলল, "আপনার গম্ভীর ভাবটাও মেনে নেব, আপনার রাগটাও মেনে নেব, কিন্তু আপনি যদি কাউকে পছন্দ করে ফেলেন, তখন?" এক সেকেন্ড চুপ থেকে মিমি চোখ ছোট করে বলল, "নাহ! সেটা হতে দেওয়া যাবে না! নিশান ভাই, আপনি শুধু আমার!" একটু লাফিয়ে উঠে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল মিমি, নিজের চুল ঠিক করল, তারপর দুই গালে হাত দিয়ে বলল, " তাহলে, কাল থেকে নতুন মিশন! নিশান ভাইকে কিভাবে ইমপ্রেস করা যায়, সেটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে!" একটা দুষ্টু হাসি ফুটল মিমির মুখে। "মিমি তালুকদার, গেট রেডি! তোমার লাভ স্টোরি শুরু হতে যাচ্ছে!" মিমি যে গত তিন বছর ধরে নিশানকে ভালোবাসে এটা সে ছাড়া আর কেও জানেনা। মূলত নিশান হলো মিমির কিশোর বয়সের আবেগ। মিমির মধ্যে যে অস্থিরতা এবং আবেগের ঝড় চলছে, তা খুবই স্পষ্ট। নিশানকে সে যে তিন বছর ধরে ভালোবাসে, কিন্তু নিশান তাকে শুধুই ছোট বোনের মতো দেখে, এটা মিমির জন্য সত্যিই জটিল। তার আবেগের এই দ্বন্দ্ব গল্পে একটি বড় মোড় আনলেও আনতে পারে। ~~★ নাসিরুল তালুকদার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই শৈলী ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে নামল। তার মনে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। বড় আব্বুর চোখের সেই স্নেহমাখা দৃষ্টি, খাদিজা তালুকদারের ব্যবহারের জন্য তার ক্ষমা চাওয়া, এসব যেন কিছুটা অবিশ্বাস্য লাগছে। কপালের ভাঁজ খুলতে না খুলতেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর আলতো পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। চোখেমুখে এখনো দিনের ক্লান্তির ছাপ। ট্যাপ খুলে দুই হাতে পানি নিয়ে মুখে ছিটিয়ে দিল। ঠান্ডা পানি গাল বেয়ে নামতে থাকল, শৈলী এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে রইল। নিজেকে একটু শক্ত করতে হবে। গভীর নিঃশ্বাস ফেলে মুখের পানি মুছে আয়নার দিকে তাকাল। আয়নার মধ্যে সে যেন আরেকটা শৈলীকে দেখল, একটা ক্লান্ত, একা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয়ংকরভাবে শক্ত হতে থাকা শৈলী। "সব ঠিক হয়ে যাবে..." নিজেকেই আশ্বস্ত করল সে, যদিও কথাটার ভরসা তার নিজের কাছেই কম লাগছে। ~~★ সদর দরজার কলিং বেলের শব্দে পুরো বাড়ি খানিক নীরব হয়ে গেল। মিমি তখনো ফোনের স্ক্রিনে নিশানের ছবির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু হঠাৎ বেলের শব্দে চঞ্চল হয়ে উঠল। "কে এলো এই রাতে?" নিজেকেই প্রশ্ন করল সে। কিন্তু হঠাৎ নিশানের আসার কথা মনে পড়তেই অপেক্ষা না করেই বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠল মিমি। নিঃশব্দে দরজার কাছে যাওয়ার বদলে একেবারে ছোটখাটো দৌড় শুরু করল সে। সিঁড়ির কয়েক ধাপ একসাথে পেরিয়ে দ্রুত নিচে নামতে থাকল। তার ভেতরে অদ্ভুত এক উত্তেজনা কাজ করছে। নিশান? হবে নাকি? নিচে নেমে প্রায় নিঃশ্বাস আটকে দরজার হাতল ধরে দ্রুত টেনে খুলে ফেলল মিমি। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিকে দেখে তার হৃদস্পন্দন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল...নিশান ক্লান্তিমাখা মুখটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মিমি দরজা খুলেই মুখভরা হাসি নিয়ে বলল, "নিশান ভাই! এত রাতে এলেন? জানেন, আমি ভাবছিলামই যে আজ আপনি আসবেন না!" কিন্তু নিশানের মুখের ভাব একটুও পরিবর্তন হলো না। তার ভ্রু কুঁচকে রইল, চোখে যেন খানিক অস্বস্তি। নিশান ভেবেছিল প্রতিদিনের মতো শৈলী দরজা খুলবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোনো উত্তর না দিয়ে সে ভিতরে ঢুকতে থাকল। কিন্তু মিমির চোখ চকচক করছিল। আজ অনেকদিন পর নিশান ভাইকে এত কাছ থেকে দেখছে, তাও শুধু তার দরজা খোলার অপেক্ষায় ছিল যেন! নিশান ভেতরে ঢুকতেই মিমি দরজা বন্ধ করে তার পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। চোখে যেন খেলা করছে দুষ্টু উচ্ছ্বাস, তবে নিশানের মুখের গাম্ভীর্য একটুও কমল না। "কী ব্যাপার নিশান ভাই, আজ এত দেরি হলো কেন?" মিমি কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞাসা করল। নিশান জবাব দিল না, শুধু হাতের ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে নীরব রইল। মিমি থোড়াই কেয়ার করে আবার বলল, " আপনাকে আজ বাসায় আসতে দেখে ভালো লাগছে! জানেন, আজ বিকেলে আমরা তিন বোন মিলে কত গল্প করলাম। আপনি থাকলে আরো ভালো হতো। " নিশান এবারও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না, যেন কিছু শোনেনইনি। তবে তার চোখ আশেপাশে একবার ঘুরে নিল। মিমি খানিকটা হতাশ হয়ে বলল, "আপনি এমন চুপচাপ কেন? নাকি মুড অফ?" নিশান এবারও কিছু বলল না, কেবল তার চোয়াল শক্ত হলো একটু। মিমির ঠোঁটের কোণে হাসি খেলল, কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আপনি কি খেয়েছেন? চাইলে কিছু এনে দিতে পারি!" নিশান হালকা মাথা নাড়িয়ে বলল, "না লাগবে না।" তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, সোজা নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। মিমি চুপচাপ তাকিয়ে থাকল, চোখে একরকম জেদ। নিশান ভাই হয়তো বুঝতেও পারে না, সে কতটা আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন তাকে নিয়ে ভাবে! মিমি এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে নিশানের ঘরের দরজার দিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ যেন মাথায় একটা বুদ্ধি এল! চটপট পায়ের নুপুর বাজিয়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটল। "নিজের মুখে না বললেও, নিশান ভাই পানি খাবে না, এটা কি হয়?" নিজেকেই বলল মিমি, ঠোঁটে হাসির ঝিলিক। রান্নাঘরে গিয়ে দ্রুত একটা গ্লাসে পানি ঢালল। তারপর নিজের অভ্যাস অনুযায়ী একটু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করল। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে নিশানের ঘরের দিকে এগোতেই মনে মনে কেমন একটা রোমাঞ্চ কাজ করল। কিন্তু দরজার সামনে গিয়ে একটু ইতস্তত করল। নিশান কি বিরক্ত হবে? এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর নিজেই নিজেকে বোঝাল, "আমি তো কেবল পানি দিতে এসেছি, এতে এত ভাবার কী আছে?" অবশেষে দরজায় কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে নিশান ভ্রু কুঁচকালো। সে জানে কে কড়া নেড়েছে। তৎক্ষনাৎ গম্ভীর কণ্ঠে নিশান বলল, "কী?" মিমি খিলখিল করে হেসে বলল, "আপনার জন্য পানি এনেছি। খাবেন তো?" ভেতর থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না। তারপর নিশান দরজা খুলে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল, চোখেমুখে সেই চিরচেনা নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি। মিমি এগিয়ে গিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল, কিন্তু নিশান কোনো কথা না বলে গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে শেষ করল। এরপর গ্লাসটা মিমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সৌজন্যের হাসি হেসে বলল, "ধন্যবাদ। এবার যা।" মিমি একটু হতাশ হলো। নিশান তাকে ঘরে ঢুকতেও বলল না। এভাবে দরজায় দাঁড়িয়েই... তবে আবেগের বয়সে থাকা মিমি চটপট হাসিমুখে বলল, "আচ্ছা, কিন্তু আপনাকে একটু বেশি ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আপনি ঠিক আছেন তো?" নিশান এক মুহূর্ত মিমির দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল, " হুম, ঠিক আছি। তুই যা। খাবার টেবিলে পরে দেখা হবে।" তারপর আর কিছু না বলে দরজা বন্ধ করে দিল। মিমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তার চঞ্চল চোখের গভীরে আজ একটুখানি দুঃখ খেলা করল, এত সহজে দরজা বন্ধ হয়ে গেল! নিশান ভাই কি একটুও বোঝে না? নাকি বুঝেও ইচ্ছে করে এড়িয়ে চলছে? ~~★ রাত কিছুটা বেড়ে গিয়েছে৷ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। আকাশে কিছুটা মেঘ জমেছে আর বাতাসে ঠান্ডা শীতলতা। বাড়ির প্রতিটি কোণায় একটা নীরবতা ছড়িয়ে পড়েছে, যেন সময় থেমে গেছে। শুধুমাত্র বাইরে শিমুল গাছের পাতা যেন নরমভাবে বাতাসে মৃদু ঝরে পড়ছে। রাতের আধারে, জানালার কাঁচে উজ্জ্বল আলো এসে পড়ছে, কিন্তু ভিতরে ছিল একটা চাপা নিঃশব্দতা। শৈলী চোখের কোণে কিছুটা অশ্রু জমিয়ে, ধীর পায়ে বাবার রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মন ছিল ভারাক্রান্ত, চোখে অদৃশ্য এক কষ্টের ছায়া। বাবার প্যারালাইজড অবস্থা তাকে প্রতিদিনই কষ্ট দেয়, কিন্তু তারপরও সে বাবার কাছে যায়, যতটুকু সময় পায় তাকে সঙ্গে রাখে। রুমে ঢুকতে, শৈলী শরিফুল তালুকদারের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে, তার মুখের দিকে এক পলক তাকালো। চোখ বুঁজে আছেন শরিফুল, কিন্তু গায়ের পাতলা চাদরটি তার শরীরের ওপর অতি যত্ন সহকারে রাখা। শৈলী খুব আস্তে ধীরে এক হাত দিয়ে বাবার হাতে হাত রাখল, যেন তার কোনো কষ্ট না হয়। বাবার পেশি শিথিল, এক সময়ের শক্তিশালী মানুষ এখন শয্যাশায়ী। শৈলী একটু নেমে গিয়ে বাবার কপালে এক চুমু দিলো, তারপর তার হাতটি আরও শক্ত করে ধরে রাখল। চোখে জমানো অশ্রু একে একে গাল বেয়ে পড়ছিল, কিন্তু সে কোনো শব্দ করলো না। কিছুই বলল না, শুধু বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গী হতে চাইল, যেন কিছুটা শান্তি পায়। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর শৈলী মাথা ঠেকিয়ে দিল শরিফুলের হাতের উপর। ক্লান্ত কন্ঠে ধীর গলায় বলল, " তুমি সুস্থ থাকলে কী হতো বাবা? তোমার কন্ঠটা শুনতে পেলে কি আমি সব কষ্ট ভুলে যেতাম না? একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে কি খুব ক্ষতি হয়? আমার যে ভালো লাগে না। বিশ্বাস করো, তুমি এখানে না থাকলে আমি কবেই চলে যেতাম। যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকেই যেতাম। কোনো পিছুটান নেই। কেও নেই আমার। বাঁচতে ইচ্ছে করে না বাবা।" শৈলী ধীরে ধীরে কথাগুলো বলছে, যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা ব্যথাগুলো একে একে বেরিয়ে আসছে। তার কণ্ঠে অনেকটা ভাঙন, এক ধরনের নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্বের প্রতিধ্বনি। শরিফুল চুপচাপ শুয়ে, চোখে কোনো আলো নেই, শুধু শৈলীর অসহায়ত্বের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার মতো এক মৃদু সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা। শৈলী আবার মাথা তুলে, বাবার অসাড় হাতটি একটু শক্ত করে ধরে রাখে। সেও জানে, তার বাবার কাছে কোনও উত্তর নেই। শরিফুল এখন নিজের শরীরের মধ্যে আটকে গেছে, কিছুই করতে পারে না। কিন্তু তার পাশেই শৈলী, যেন তার জন্য বেঁচে থাকার শেষ লড়াই করছে। শৈলী চোখের অশ্রু মুছল, আবার বাবার কাছে নতমস্তক হয়ে বসল। ভেবেছিল, হয়তো একদিন এই কষ্টগুলো কেটে যাবে, কিন্তু যখন সেটা মনে আসে না, তখন এসব অশ্রু আর কথা যেন সঙ্গী হয়ে থাকে। “তুমি যদি ভালো থাকতে, বাবা... তখন আমি জানতাম...আমি জানতাম সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে!" বলতে বলতেই সজোরে কেঁদে উঠলো শৈলী। শৈলীর কান্নার আওয়াজ শোনার সাথে সাথে পুরো ঘর যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুক ফেটে যাওয়া কষ্টের চিহ্নগুলো, যে যন্ত্রণা সে কতদিন ধরে বুকে লুকিয়ে রেখেছিল, তা বেরিয়ে আসছিল একে একে। শরিফুলের নিস্তেজ হাতের নিচে শৈলীর মাথা ঠেকে থাকলেও, তিনি কিছুই করতে পারছিলেন না। শৈলী নিজেকে একা অনুভব করছিল, যেন পৃথিবী তাকে একা ছেড়ে দিয়েছে, আর কোনো পথ নেই তার সামনে। শৈলী কান্নায় ডুবে আছে, তার অশ্রু যেন থামছিল না। হঠাৎ পেছন থেকে একটি হাত তার কাঁধে ড়ল, আর একটুখানি চাপ অনুভব করল শৈলী। অবচেতন মনে সে ঘাড়টুকু সামান্য উঁচু করে ধরল, জানল, এটা রাশিদা তালুকদারের হাত। রাশিদা তালুকদারের চাপা, শক্ত হাতটা এক মুহূর্তের জন্য শৈলীর শ্বাসে শান্তির সুর তুলে দিল। শৈলী মাথা না তুলেই ফিসফিস করে বলল, " মামনি..." রাশিদা তালুকদারের কণ্ঠে মৃদু কিন্তু দৃঢ় শাসন ছিল, তবে গভীর কিছু যেন এক প্রকার শুশ্রূষা ছিল। তিনি মৃদু এক শ্বাস ফেলে বললেন, " আমার ভাইটার কাছে এভাবে কাঁদিস না শৈলী। সহ্য করতে পারবে না। যেভাবে আছে, সেভাবেই বাঁচতে দে একটু। নইলে তোর অবস্থা দেখে জীবনীশক্তি টাও হারিয়ে ফেলবে রে। শৈলী ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করল, রাশিদার হাতের চাপটা আরও শক্ত হতে শুরু করলো। " চল শৈলী, খেতে চল।" ~~★ ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে পড়েছে। খাদিজা তালুকদারের মন মেজাজ এখনো চটে আছে। যে করেই হোক শৈলীকে এ বাড়ি থেকে তাড়াতেই হবে আর এই পরিকল্পনা সফল করতে সে যে কোনো কিছু করতে রাজি। নাসিরুল তালুকদার অফিসের কিছু ফাইল দেখছেন। রিমি এবং মিমি প্লেট গোছাতে ব্যস্ত। একটু পরেই নিশান ধীর গতিতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকল। তার চোখে কিছুটা ধূসরতা এবং চিন্তা-ভাবনার ছাপ ছিল, কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন কিছুটা নীরব শান্তিতে ফিরে এসেছে। তার পা টেবিলের দিকে এগিয়ে চলল, এবং একে একে পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশে গিয়ে বসলো। নিশানকে দেখে নাসিরুল দৃঢ় কন্ঠে বললেন, " কোথায় ছিলে সারাদিন? " নিশান বাবার দিকে তাকিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, " ফ্যাক্টরির কিছু কাজ ছিল। ধানমন্ডির পুরোনো ফ্যাক্টরিটা দেখতে গিয়েছিলাম।" নাসিরুল মাথা নেড়ে বললেন, " কী দেখলে? বুঝেছো কিছু?" " যত দ্রুত সম্ভব ফ্যাক্টরিটা বন্ধ করা দরকার। ঐ কোম্পানি গত দু বছর ধরে শুধু লোকসানেই আছে। " নাসিরুল তালুকদার কিছুক্ষণ নীরবে চিন্তা করলেন। তাঁর চোখে চিন্তার রেখা, যেন তিনি ফ্যাক্টরির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবছেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনি কপালের ঘাম মুছে বললেন, "আহ, আমি জানি। তবে ওটা বন্ধ করা সহজ নয়, অনেক কিছু জড়িত। কিন্তু তুমি ঠিক বলেছো, আমাদের এই লোকসান চলতে দেওয়া উচিত নয়।" নিশান একটু নীরব থেকে মাথা হেলিয়ে বলল, " আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, যে সময় নষ্ট করা আর কিছুই না। যদি আমাদের হাতে সময় থাকে, তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ওখানকার কাজ ভালো লাগেনি আমার। তোমার ম্যানাজারও সুবিধার না।" নাসিরুল আবার মাথা নেড়ে বললেন, " বুঝেছি। তবে এই সিদ্ধান্তটা একসাথে নিতে হবে। আমাদের অনেক কিছু দেখার আছে। আর কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করি। তারপর সিদ্ধান্ত নেব।" খাদিজা তালুকদারের মুখে একটু শূন্যতা ফুটে উঠল, তবে তিনি কিছু বললেন না। সে শুধু সবার কথাবার্তা শুনছেন এবং নিজের মনস্থির করছিল কীভাবে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। রিমি প্লেট গুছিয়ে সবার জায়গায় রেখে দিল। কিছুক্ষণ পর রাশিদা শৈলীকে নিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। নিশান আড়চোখে একবার সেটা দেখে নিজের প্লেট এগিয়ে নিল। রাশিদা শৈলীকে নিজের পাশে বসালো। এদিকে মিমি এসে ধপ করে নিশানের পাশে বসে পড়লো। নিশান ভ্রু কুঁচকালো, তবে বলল না কিছুই। শৈলীও মাথা উঠিয়ে এক পলক নিশানকে দেখল। ~~★ রাত গভীর হয়ে এসেছে। আকাশে ছড়িয়ে আছে নক্ষত্রের মৃদু আলো, তবে চারপাশে কিছুটা সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। বাতাসে ঠাণ্ডা এক অনুভূতি, যেন রাতে কিছু একটা ঘটে যাবে। বাড়ির জানালাগুলো বন্ধ, ঘরের আলো কমিয়ে আসতে থাকে, শৈলী নিজেকে আরেকটু একাকী অনুভব করছে। রাতের এই নিস্তব্ধতা যেন তার মনকে আরও ভারী করে তুলেছে। বাড়ির ভিতরে অল্প কিছু নরম আলো এসে পড়েছে। পেছনে, কোথাও দূরে রাতের সিটি লাইটের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ঘর থেকে এসব কিছুই যেন হারিয়ে গেছে। শুধু শৈলীর হৃদয়ের মধ্যে কিছু অজানা কষ্ট আর শঙ্কা ভর করেছে। অন্যদিকে, বাড়ির অন্যরা নিজেদের মতো আছে, রিমি চুপচাপ পড়াশোনা করছে, খাদিজা তালুকদার ঘরের মধ্যে হাঁটছে, আবার মিমি হয়তো নিজের মনে কিছু ভাবছে। কিন্তু সবাই জানে, রাতের এই গভীরতায় কিছু একটা অদৃশ্য চাপ যেন বাড়ির একেকটি কোণে ফেলে দিয়েছে এক অদ্ভুত শীতলতা। নিশানও নিঃশব্দে নিজের ঘরের দিকে রওনা হয়ে গিয়েছে। তার চোখে তীব্র এক দৃষ্টি, যেন সে কিছু একটা ভাবছে, বা হয়তো তার মন এক জায়গায় আটকে আছে। তবে, বাইরে চলমান রাতের অন্ধকারে, তাকে এক মুহূর্তের জন্যও যেন শান্তি পাচ্ছিল না।সব কিছুই যেন থমকে গিয়েছে, আর রাতের এই গভীরতা এক এক করে সবাইকে তাদের নিজস্ব দুনিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে। শৈলী শুয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখ একদম নিশ্চল, স্থির। হঠাৎ বালিশের পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনটা অল্প শব্দে বেজে উঠলো। নোটিফিকেশনের টোন শুনে শৈলী ফোনটা এনে চোখের সামনে ধরল। একটা মেসেজ এসেছে। ভ্রু কুঁচকালো সে। মেসেজের জায়গায় চাপ দিতেই আননোন নাম্বার থেকে আসা এক মেসেজ ভেসে উঠলো। স্ক্রিনে জ্বলে উঠে একটা লাইন, ❝ উল্টোপাল্টা চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে একটু ঘুমালে ভালো হয়।❞ চোখ বড় করে তাকালো শৈলী। আননোন নাম্বারটা ভালো করে দেখলো৷ এই নাম্বার একেবারেই অচেনা। কখনোই দেখেনি আগে। কার নাম্বার হতে পারে? আর শৈলীকে এমন মেসেজ দিলোই বা কেন? কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুল করে এসেছে ভেবে শৈলী ফোনটা রাখতে না রাখতেই আবারো আরেকটা শব্দের ঝংকারে ফোনটা বেজে উঠলো৷ এবারো চমকে তাকালো সে। তবে এবার এটা মেসেজ নয়, কেও কল করেছে। ফোনটা আবারো চোখের সামনে ধরতেই ভেসে উঠলো, " নিশান ভাই "। শৈলী এবার তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে উঠে বসল। এত রাতে নিশানের কল পাওয়াটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। একটা ঢোক গিলে নিজেকে আশ্বস্ত করে শৈলী কলটা ধরল। কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ওপাশ থাকে গম্ভীর পরিচিত সেই পুরুষালী কন্ঠে আদেশ ভেসে এলো, " দুটো শাল নিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ছাদে আসবি। কথার অবাধ্য হলে আমি গিয়ে তোকে বারান্দা থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেব।"
