প্রেমের লাল ছোয়া পর্ব ৫

প্রেমের লাল ছোয়া

প্রেমের লাল ছোয়া

নিশানের ভয়ানক হুমকির তোপে তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো শৈলী। সমুদ্রের ঢেউয়ের ন্যায় ভেসে থাকা চুলগুলো একহাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতেই আশেপাশে তাকিয়ে গুছিয়ে রাখা নিজের শাল টা খুঁজলো। এই কনকনে ঠান্ডায় মেরুন রঙের এই শাল টাই তার একমাত্র অবলম্বন। সারি সারি বই গুচ্ছিত টেবিলের সামনে থাকা চেয়ারে ভাঁজ করে রাখা শালটা দেখেই শৈলী চুল খোঁপা করে ফেলল। দ্রুত শাল পেঁচিয়ে এগিয়ে গেল আলমারির দিকে। আলমারির দরজা খুলে ভেতরে হাত বাড়িয়ে দিল সে। ঠান্ডা রাতের শীতে শরীর একটু কুঁকড়ে আসছিল, কিন্তু নিশানের আদেশ তাকে বসে থাকার সুযোগ দিল না। একের পর এক শালে হাত বোলাতে লাগল শৈলী। মেরুন রঙের উলের শালটা তো নিজের জন্য নিয়ে নিয়েছে, এখন নিশানের জন্য একটা ভালো শাল দরকার। তবে শৈলী জানে, নিশান কোনো বাহারি বা নরম শাল পছন্দ করবে না। কেবল একরঙা, ভারী কিছু হলেই চলবে। মানুষটাই তো একরঙা! খুঁজতে খুঁজতে এক কোণায় রাখা কালো রঙের উলের শালটা চোখে পড়ল। নিশান একবার এটা নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পরে কোথাও রেখে ভুলে গিয়েছিল। শৈলী দেখে সেটা আবার আলমারিতে তুলে রেখেছিল। শালটা হাতে নিয়ে দ্রুত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গেল শৈলী। চুলগুলো আরও ভালো করে বেঁধে নিল, চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু সে পাত্তা দিল না। নিশানের রাগী স্বর এখনো কানে বাজছে। তাড়াতাড়ি পায়ের মোজা পরে নিল, ঠান্ডা যেন না লাগে। সব গুছিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতেই বুক ধক করে উঠল। নিশান কেনো এত রাতে তাকে ছাদে ডাকল? আর সেই অচেনা নম্বরের মেসেজ? এ দুই ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে? নাকি নিশান কেবল কোনো দরকারি কথা বলার জন্যই ডেকেছে? আর অচেনা নাম্বারের মেসেজটা নিতান্তই এক কাকতালীয় সাময়িক ঘটনা! কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার সময় নেই। নিশানের ধমকের কথা মনে পড়তেই হাতের শাল আরও শক্ত করে চেপে ধরে শৈলী সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল, নিশানকে বেশি অপেক্ষা করানো মানেই আরও বড় ঝামেলা আদর করে ডেকে আনা। রাত গভীর হয়েছে, আকাশের বুকজুড়ে ঝলমলে তারা ছড়িয়ে আছে। পূর্ণিমার আলো চারপাশে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে দিয়েছে, যেন পুরো পৃথিবী এখন শুধুই নরম রুপোলি আভায় ঢেকে গেছে। ঠান্ডা হাওয়া আলতো করে বইছে, মাঝে মাঝে গা ছমছমে অনুভূতি তৈরি করছে। দূর থেকে ভেসে আসছে কোথাও যেন রাতজাগা কোনো পাখির ডাক, কিংবা কোনো কুকুরের একলা ঘেউ ঘেউ। শহরের কোলাহল থেমে গেছে, এখন শুধু রাতের নির্জনতা আর বাতাসের স্নিগ্ধ সুর চারপাশ ঘিরে রেখেছে। ছাদের এক কোণে নিশান দাঁড়িয়ে আছে। দু'হাত শক্ত করে রেলিং ধরে রেখেছে সে, আঙুলের গিঁটগুলো পর্যন্ত ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার মুখে কোনো অনুভূতি নেই, যেন কোনো গভীর শূন্যতায় সে ডুবে আছে। চোখ দুটি স্থির, সামনের ফাঁকা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু সে আদৌ কিছু দেখছে কিনা, তা বোঝা যাচ্ছে না। ঠান্ডা বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে, তবু সে একবারের জন্যও নড়ছে না। শৈলী ধপধপ শব্দ করে ছাদে উঠে এসে নিশানকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে গেল। চলন্ত পা দুটি স্থির করে রাখল। চোখ বরাবরের মতো প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে রয়েছে। নিশানের এই অনুভূতিহীন, নির্লিপ্ত অবস্থাটা সে অনেকবার দেখেছে, কিন্তু আজ কেন যেন একটু বেশি অস্বাভাবিক লাগছে। বুকের ভেতর অজানা শঙ্কা দোলা দিয়ে উঠল, যেন নিশান কোনো অদৃশ্য ভারে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অথচ কাউকে কিছু বলছে না। হাতের শালটা শক্ত করে চেপে ধরে শৈলী ধীরে ধীরে নিশানের দিকে এগিয়ে গেল, ঠান্ডা বাতাস তার গায়ে কাঁপন ধরাচ্ছে, কিন্তু নিশানের এই নীরবতা তাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছে। বেশিদূর এগোলো না শৈলী। খুব দূরত্ব নিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ডাকতে চাইলো। তবে সে কিছু বলে উঠার আগেই চাপা স্বর ভেসে আসলো অপাশ ফিরে শূন্যে তাকিয়ে থাকা পুরুষের থেকে, " লুকোচুরি খেলছিস আমার সাথে?" খানিক চমকে গিয়ে তৎক্ষনাৎ বুকে থু থু করে চোখ পিটপিট করলো শৈলী। নিশান এদিকে না তাকিয়েও কীভাবে তার উপস্থিতি বুঝলো কোনোভাবেই মাথায় ঢুকল না সদ্য অষ্টাদশীর। অবাকের রেশ কাটাতে না কাটাতেই নিশান এদিকে না তাকিয়েই চাপা কন্ঠে ফের বলে উঠলো, " পা টিপে টিপে আসার মানে কী? আমি তো তোকে আসতেই বলেছি। লুকোচুরির কী দরকার?" বলে এ পর্যায়ে মাথা ঘুরিয়ে শৈলীর দিকে ফিরে তাকালো নিশান। দুহাত বুকে গুঁজে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। শৈলী অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেল। তার হাতের শালটা নিশানের জন্য এনেছিল, কিন্তু এখন সেটা আঁকড়ে ধরে যেন নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছে। নিশানের দৃষ্টি তার দিকে স্থির, গভীর, যেন ভেদ করে দিতে চাইছে শৈলীর ভাবনাগুলো। ঠান্ডা বাতাসে শৈলীর কাঁধ কেঁপে উঠলো, তবু সে নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "লুকোচুরি খেলছি না নিশান ভাই। বাড়ির সবাই ঘুমিয়েছে তো..তাই ধীরে আসছিলাম যেন শব্দে কেও টের না পায়!" নিশান শৈলীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ঠান্ডা বাতাস তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে, কিন্তু সে যেন সেসব অনুভবই করছে না। গভীর, স্থির চোখে শৈলীকে দেখে নিয়ে চাপা স্বরে বলল, "সবাই ঘুমিয়ে গেছে, তুই এভাবে আসবি, সেটা জানতাম। কিন্তু তোর পা টিপে টিপে আসার দরকার ছিল না। এক্সাক্টলি তোর ভয় টা কাকে নিয়ে?" শৈলী নিশানের চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। সে একটু ইতস্তত করে বলল, "ভয় কাকে নিয়ে নয়, ভয় কেনো... সেটা বোঝার চেষ্টা করুন নিশান ভাই। এই বাড়ির কেও আমাকে এখানে দেখতে চায় না। এভাবে মাঝরাতে কারো চোখের সামনে পড়ে অশান্তি করতে মোটেই ইচ্ছুক নই।" নিশান এক মুহূর্ত চুপ থেকে ধীরে ধীরে রেলিং থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "এই বাড়ির সবাই চাইবে কি চাইবে না, সেটা নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই।" বলে আবারো মুখ অন্যদিকে করল। খানিক নীরবতা। এক সেকেন্ড.. দুই সেকেন্ড... তিন সেকেন্ড... সময় এগোতেই লাগলো। এমন নীরবতায় অসস্তির বন্যা বয়ে যাচ্ছে শৈলীর সর্বাঙ্গে, শেষে এবার গভীর শ্বাস নিয়ে সে বলল, " আপনি... আপনি এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন কেনো নিশান ভাই? ঘুমোবেন না?" নিশান শৈলীর কথার জবাব দিল না, বরং খানিকক্ষণ তাকিয়েই থাকল তার দিকে। হঠাৎ সে চোখ ফিরিয়ে একটু হেসে ফেলল, তবে সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না, বরং এক ধরনের শূন্যতা লুকিয়ে ছিল সেখানে। চোখ নামিয়ে রেলিংয়ে আঙুল চালিয়ে ধীরে ধীরে বলল, " ঘুম! বিছানায় গা এলিয়ে ঘুমে তো তারাই যায়, যাদের মনে শান্তি আছে, শৈলী। আর আমি তো সেই মানুষ, যার রাতের ঠিকানা শুধু অস্থিরতা...!" শৈলী নিশানের কথাগুলো শুনে চুপ করে গেল। তার ভেতর কোথাও যেন একটা অদৃশ্য শিরশির অনুভূতি বয়ে গেল। নিশানের এই নির্লিপ্ত অথচ গভীর কথাগুলো তার মনে কেমন যেন ছাপ ফেলে গেল, ঠিক যেন রাতের আকাশে একলা জ্বলতে থাকা কোনো নক্ষত্রের মতো। "মানুষ শূন্যতার ওজন বোঝে না, যতক্ষণ না সেটার ভার তার হৃদয়ের শিরা ছিঁড়ে দেয়। আমি সেই ভার বয়ে চলেছি, প্রতিদিন, প্রতিঘণ্টা।" শৈলী এবার সত্যিই থমকে গেল। নিশানের গলা যেন অন্যরকম লাগছে আজ। ভেতরে জমে থাকা একরাশ ক্লান্তি আর চাপা যন্ত্রণা গোপন করে রাখা স্বরে। শৈলী ধীরে ধীরে আরেকটু এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল শালের জন্য। শান্ত গলায় ছোট্ট আবেদন করলো যেন, "শালটা নিন, নিশান ভাই। ঠান্ডা লেগে যাবে!" নিশান শৈলীর দিকে তাকাল, তার চোখে কিছু ছিল, এক মুহূর্তের জন্য বোঝা গেল না। কিন্তু পরক্ষণেই সে একটা টু শব্দ না করে হাত বাড়িয়ে শালটা নিয়ে কাঁধে জড়িয়ে নিল। শৈলী নিশানের মুখের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু বরাবরের মতো পারল না। নিশান যেন তার চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছে। এই নীরব রাতের চাঁদ আর তারা গুলো তাদের দু’জনকে নীরবে দেখছে, কিন্তু কেউই মুখ খুলছে না। বাতাস বইছে ধীর লয়ে, যেন নিশানের মনের অতল গহ্বরের সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলছে এই রাত। হঠাৎ নিশান একটা বড় শ্বাস ফেলে শৈলীর দিকে তাকালো। শৈলীও তৎক্ষনাৎ ভদ্রের মতো মাথা নিচু করে নিশানের কথা শোনার অপেক্ষায় রইলো। নিশান কিছুক্ষণ শৈলীর দিকে তাকিয়েই রইল। যেন কিছু বলবে, আবার যেন নিজেই তার ভেতরের কথাগুলো আটকে রাখছে। ঠান্ডা বাতাস তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে, চোখের গভীরতা আরও ধোঁয়াটে করে তুলছে। হঠাৎ একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পকেটে হাত গুঁজে নিচু গলায় নিশান বলল, " কাল তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাচ্ছি....।" শৈলী বিস্মিত চোখে তাকাল, কিন্তু নিশানের মুখে কোনো ব্যাখ্যা নেই। সে শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন শৈলীর প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় নেই, বরং নিজের মনে কিছু স্থির করছে। শৈলী কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করল, " কোথায়?" নিশান চোখ নামিয়ে রেলিংয়ের দিকে তাকাল, যেন উত্তরটা বাতাসে ছড়িয়ে দিল, " এখন জানতেই হবে? না জানলে হয় না?" শৈলী মাথা নিচু করে ঘাড় ডানে এলিয়ে দিল। নীরবে বুঝিয়ে দিল, " হয়, হয়। আপনি বললে সব হয় নিশান ভাই।" নিশান নীরবে শৈলীর মাথা ঝাঁকানো দেখে সন্তুষ্ট হলো। ঠান্ডা কন্ঠে বলল, "কাল জানতে পারবি। সকাল আটটায় তৈরি থাকিস। দেরি করলে আমি কিন্তু রেখে চলে যাব। " শৈলী তৎক্ষনাৎ মাথা তুলে জোর গলায় জানান দিলো, " আপনার অফিস? " শৈলী ভেবেছিল নিশান হয়তো নিজের অফিসের কথা ভুলে গেছে। অথচ বোকা শৈলী আজও নিশানকে ঠিকঠাক ধরতে পারল না। বাঁকা হেসে নিশান ধীর গলায় বলে উঠলো, " ছুটি নিয়েছি....আকাশ সব সামলাবে। " শৈলী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো নিশানের দিকে। অফিসের এত কাজ ফেলে ছুটি নিয়েছে? নিশান, যে নিজের কাজের বাইরে কিছুই ভাবতে চায় না, সে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিল কেন? শৈলীর চোখেমুখে প্রশ্ন দেখে নিশান আর কিছু না বলে আবার শূন্যে তাকাল। যেন রাতের আকাশের তারা গুনছে, অথবা নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকোচ্ছে। শৈলী এবার সাহস করে ধীর পায়ে একটু এগিয়ে এসে নিশানের সামনে দাঁড়াল। ঠান্ডা বাতাসে ওর শাল উড়ে যেতে চাইছে, কিন্তু সে শক্ত করে ধরে রাখল। "আপনি আসলে কোথায় নিয়ে যেতে চান আমাকে নিশান ভাই? " নিশান এবার চোখ তুলে তাকাল। গভীর দৃষ্টি, যেন রাতের চেয়েও গাঢ় কিছু ওর ভেতরে লুকিয়ে আছে। এক মুহূর্ত শৈলীর দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর নিচু স্বরে বলল, "কোথাও....হয়তো এমন এক জায়গা, যেখানে আজ পর্যন্ত তোকে কেউ নিয়ে যায়নি।" শৈলীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। নিশানের কথার মানে বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু তার গভীর, রহস্যময় চোখ যেন তাকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। শৈলী কিছু বলবে কি বলবে না, বুঝে ওঠার আগেই নিশান ধীরপায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। শৈলী শুধু তার চলে যাওয়া দেখল, মনে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে, যার উত্তর হয়তো কালই মিলবে। অথচ তারা জানতো না, তাদের দুজনের সেই নির্জন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ছিল আরেক জোড়া চোখ। ছাদের এক কোণ, অন্ধকারে ঢাকা, সেখানে গভীর এক দৃষ্টি স্থির হয়ে ছিল নিশান আর শৈলীর দিকে। সেই চোখে ছিল অস্বাভাবিক ক্ষোভ, কেমন যেন এক অস্থির আগুন জ্বলছিল। নিশানের প্রতিটা অঙ্গভঙ্গি, শৈলীর প্রতিটা অভিব্যক্তি সে দেখছিল, পর্যবেক্ষণ করছিল এক অদ্ভুত স্থিরতায়। নিশান যখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল, শৈলীও ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে এগোতে থাকলো। আর তখনই, সেই চোখ দুটো সামান্য নড়ল। এক নিঃশ্বাসে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকারের সাথে মিশে গেল। কে ছিল সে? কেন সে এমন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল? তার চোখে যে আগুন, সেটা নিছক কৌতূহল, নাকি কিছু ভয়ানক ইঙ্গিত? কেউ বুঝতে পারল না। কেউ টেরও পেল না যে আজ রাতের নীরবতার মধ্যে এক অদৃশ্য সাক্ষী তাদের সাথে ছিল, যে এখন অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও, হয়তো শিগগিরই আবারো ফিরবে... ~~~★ নিশান নিজের ঘরের দরজাটা ধীর হাতে ঠেলে ভেতরে ঢুকল। সবকিছু আগের মতোই আছে, অথচ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা, বাইরে রাতের বাতাস বইছে, কিন্তু নিশানের বুকের ভেতর যেন অদৃশ্য এক অস্বস্তি পাথরের মতো চেপে বসেছে। সে দ্রুত গায়ে থাকা শালটা খুলতে গিয়েও থেমে গেল। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো, কপালের ভাঁজ গভীর হলো। যেন কোথাও কিছু একটা অস্বাভাবিক, কোথাও যেন তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে কিছু। হঠাৎ করেই তীব্র অস্থিরতায় ঘরের বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল নিশান। দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই শীতল বাতাস তার গা স্পর্শ করল। চারপাশের নিস্তব্ধ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে একরকম নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল সব ঠিক আছে। তবে সত্যিই কি সব ঠিক আছে? আঙুল শক্ত হয়ে রেলিং চেপে ধরল নিশান। গভীর রাতের আঁধারে শহর একটা ঘুমন্ত দৈত্যের মতো পড়ে আছে, কিন্তু নিশানের ভেতরটা নিদ্রাহীন এক বিস্ময়ে তোলপাড় করছে। বাতাসে একটা চাপা শ্বাস ফেলল নিশান, চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু মনের অস্থিরতা কমল না। বরং আরও বেড়ে গেল। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে শ্বাস ফেলে চোখ সরু করে তাকাল চারপাশে, অচেনা কিছু নেই, তবু অস্বস্তিটা যাচ্ছে না। নিশানের দৃষ্টি আচমকা পড়ে শৈলীর দেওয়া শালের দিকে। নিঃশব্দে সেটি শরীর থেকে খুলে হাতে নিল, আঙুলের ভাঁজে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। একটা গভীর শ্বাস নিল সে। কেন জানি মনে হলো, এই সামান্য কাপড়ের টুকরোটায় শৈলীর উষ্ণতা লেগে আছে, তার স্পর্শ, তার অস্তিত্বের একটুখানি ছাপ। কিন্তু এই অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না, বলা যায় না, এমনকি নিজেকেও বোঝানো যায় না। শালটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে আকাশের দিকে তাকাল নিশান। আজকের রাতটা যেন অন্যরকম। অন্ধকার আকাশের গভীরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা কাউকে বলা যায় না, যা শুধু অনুভব করা যায়,একান্ত নিজের মতো করে, একা। নিশান জানে, তার বুকের ভেতর যে অনুভূতিটা আজ ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটার কোনো নাম নেই। এটা ভালোবাসা, নাকি কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়, সে জানে না। শুধু জানে, এই অনুভূতি কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার নয়। এটা একান্ত তার নিজের, গোপনে লালন করা এক আবেগ, যা কাউকে বোঝানো যায় না, শুধু নীরবতায় বহন করতে হয়....চিরকাল। নিশান শালটি হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, তার চোখ এক মুহূর্তের জন্যও অন্ধকারে হারিয়ে যায়। হঠাৎ, যেন এক নতুন আবেগে, বিড়বিড় করে সে গেয়ে ওঠে, ❝ দূর হতে আমি তারে সাধিব গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব। বাঁধন-বিহীন সেই, যে বাঁধন অকারণ।❞ ~~~★ মৃদু সূর্যরশ্মির আলো দিয়ে ভরে উঠেছে আজকের সকালটা। শীতের ঠান্ডা বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে, আর আকাশে কিছু মেঘের সারি এসে উঁকি দিচ্ছে। গ্রাম্য পাখিরা মৃদু সুরে গান গাইছে, আর রাস্তায় একটু অবসন্ন হয়ে হাঁটছে মানুষজন। এই নীরব সকালে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব হচ্ছে। শৈলী তার রুমের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে হাতে এক কাপ গরম চা নিয়ে বসে আছে। যদিও তার মন একটু ব্যস্ত, তবুও কিছুটা শান্ত। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না, অথচ তার ভিতরে একটা অস্বস্তি, একটা শঙ্কা কাজ করছে। নিশান যে তাকে ডেকে পাঠিয়েছে, তা মনে এলেই তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি সঞ্চারিত হয়। না জানি আজ কোথায় নিয়ে যাবে সে? এদিকে, নিশান সোজা উঠে নিজেকে প্রস্তুত করছে। কালকের ঘটনার পর তার মনে একটু অস্থিরতা ছিল, তবে আজ সেই অস্থিরতা দূর হয়েছে। তবুও তার মধ্যে অপ্রকাশিত কিছু অনুভূতি ছিল, যা সে নিজের ভেতরই রেখে দিয়েছে। আজ তার কাছে একটা নতুন দিন, একটা নতুন শুরু। সে জানে না, কী অপেক্ষা করছে, তবে মনে মনে এক অদ্ভুত আগ্রহ জন্ম নিচ্ছে, যেন আজ কিছু পরিবর্তন আসবে। ~~~★ সপরিবারে খাওয়ার পর্ব শেষ করে উঠে পড়েছে। রিমি কলেজের জন্য তড়িঘড়ি করে তৈরী হচ্ছে। অথচ নিজের জমজ বোন মিমিকে বিছানার হাতলে থুতনি লাগিয়ে লজ্জা মাখা রুপে নখ খুঁটতে দেখে চরম অবাক হলো রিমি। সাথে সাথে হাতে থাকা চিরুনিটা ছুঁড়ে মারল মিমির দিকে। মাথায় খট করে ব্যাথা লাগায় মুখ কুঁচকে কপাল ডলতে ডলতে বিরক্তির সুরে ক্ষেপে উঠল মিমি, " কী সমস্যা তোর? চিরুনী ছুঁড়ে মারলি কেনো?" রিমি মিমির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, " তুই আবার পাল্টা কথা বলছিস কোন সাহসে। বাজে কয়টা? ঘড়ির দিকে চোখ রেখেছিস? মা এসে দুটো চাটি মারলে তারপর বুঝবি বলদ?" মিমি এবার চোখ নাক পুরো দমে কুঁচকে ব্যাথাতুর চেহারা নিয়ে বলল, " চুপ থাক তুই। ভালো লাগছে না। " বলেই সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আবারো রিমি চিৎকার দিয়ে উঠল, " তুই আবার কী করছিস, মিমি? তোর কি কিছু বোঝার ক্ষমতা নেই? এইভাবে থাকলে তো কলেজে যেতে পারবি না! দেরি হয়ে যাচ্ছে তো!" মিমি চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত চুপ থেকে কিছুটা ভারী সুরে বলল, " তুই যা...আমি পরে যাব।" রিমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মিমির মনোভাব অনেকটাই অন্যরকম হয়ে গেছে, যেন সে খুব গভীর কিছু নিয়ে চিন্তা করছে। রিমি কিছুটা বিরক্ত হলেও, মিমির চোখে সেই অদ্ভুত ভাবটা দেখে তার মন কিছুটা নরম হয়ে গেল। কিন্তু, সে এবার বুঝতে পারছিল না, মিমি কেন এমন আচরণ করছে। "ওই কি হয়েছো তোর?" রিমি আরো বিরক্ত হয়ে বলে উঠল। মিমি এবার কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা বিছানার ওপর গিয়ে গুটিয়ে শুয়ে পড়ল। রিমির চোখে নতুন কিছু শঙ্কা দেখা দিল। মিমির আচরণ যেন অনেক কিছু গোপন করছে, কিন্তু কী সেটা? রিমি এবার খানিকক্ষণ অবাক নেত্রে তাকিয়ে ঘড়ির দিকে চোখ রাখলো। এরপর দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠলো, " পরে কখন যাবি তুই? ঘড়ি দেখেছিস? এখন গেলেই তো পাঁচ মিনিট লেইট হবে। সাংঘাতিক জ্যাম লেগেছে কারওয়ান বাজারের দিকে।" মিমি এবার ধপ করে উঠে বসলো৷ মুখে লজ্জা মিশ্রিত হাসির রেখা টেনে আঙুলে চুল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বললো, " উহু..তুই যা। আমার দেরি হবে না। আজ আমি নিশান ভাইয়ের সাথে মেট্রোরেলে যাব। বেশি টাইম লাগবে না। নিশান ভাই নিজের অফিসে নেমে যাবে আর আমি কলেজে। ব্যাস! " রিমি এবার আগের থেকেও ভ্রু কুঁচকালো। আজকাল মিমির স্বভাব তার মোটেই ঠিক লাগছে না। নিশান ভাই য়ের সাথে যাওয়ার মোটেই শখ নেই তার। এমনিতেও যাওয়ার পথে আজ নতুন একটা ক্যালকুলেটর কিনতে হবে। গত বৃহস্পতিবার একটা ফালতু ছেলের খপ্পরে পড়ে সে নিজের ক্যালকুলেটর হারিয়ে ফেলেছে। মিমি নিশান ভাই য়ের সাথে যাবে ভেবে আর চিন্তা করলো না রিমি। সস্থির শ্বাস ফেলে ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে পথ ধরলো ঘরের বাইরে। তবে তৎক্ষনাৎ মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ কিছু একটা আসতেই রিমি চট করে মিমির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, " আবে ওই! ছাগলের বাচ্চা! নিশান ভাই তো আজ অফিসে যাবেন না।" মিমি ভ্রু কুঁচকালো, " মানে? কে বলেছে তোকে?" " খাওয়ার টেবিলে বড় মামাকে তো নিশান ভাই বলল যে আজ নাকি ছুটি নিয়েছে৷ যাবে না আজ।" মিমি একটু ভেবে আবারো খুশি হয়ে গেলো, " ওহ! আচ্ছা, আমি আজ তাহলে কলেজ যাব না। একটু বিশ্রাম নিই!" রিমি দু হাত বুকে গুঁজে নেয়। ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, " মায়ের জুতোর বাড়ি খাওয়ার ইচ্ছে আছে?" মিমি এবার বিছানা থেকে উঠে সাফাই গাইতে মিথ্যে কথা বলা শুরু করলো, " আরেহ বোকা! কথা শোন। তুই তো জানিস আমার ম্যাথে কত প্রবলেম আছে। দু তিনটে জিনিস তো মাথায় একদম ঢুকে না আর যেহেতু নিশান ভাই বাসায় থাকবে। তাহলে আমি কলেজ না গিয়ে নিশান ভাইয়ের কাছে অংক গুলো বুঝিয়ে নিই।" রিমি এবার কপাল চাঁপড়ালো। এরপর বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, " গাধার তিন নাম্বার নানি, নিশান ভাই বাসায়ও থাকবে না। কি একটা কাজে শৈলী আপুকে নিয়ে একটু বাইরে যাবে বললো। তুই ওসব রংচং বাদ দিয়ে দ্রুত রেডি হয়ে নিচে আয়। আমি জুতো পরছি।" মিমিকে কিছু বলতে না দিয়ে রিমি নিচে নেমে গেল। এদিকে মিমি ভ্রু কুঁচকে অন্যমনস্ক হলো। স্নিগ্ধ ভাবে বিছানায় বসে রিমির কথা শুনে যেতেই তার চোখে এক ধরনের চাপা অস্থিরতা দেখা দিল। মুখের হালকা হাসিটা মুহুর্তের মধ্যে গায়েব হয়ে গেল, তার বদলে অদৃশ্য এক ধরনের শঙ্কা এসে ভর করল মনে। কেন যেন আজ মিমির ভেতর কিছু একটা গোপন অনুভূতি জন্ম নিয়েছে, যা সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। "নিশান ভাই শৈলী আপুকে নিয়ে বাইরে যাবে?" আপনমনে আওড়ালো মিমি। কেন তারা একসাথে বাইরে যাবে? কারনটা কী? কিছুই যেন ঠিক মনে হচ্ছে না। কেন তার অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে? কেন সে এতটা রেগে যাচ্ছে? মিমি নিজের অজান্তে নিজের আঙুলে চুল পেঁচাতে শুরু করলো। হঠাৎ করে একটা খোঁচা দেওয়া অনুভূতি মিমির শরীরের ভেতর তীব্র হয়ে উঠল, মনে হলো, কেউ যেন তার ভালোবাসা লুকিয়ে নিয়েছে আর তার ওপর কষ্ট দিচ্ছে। কেন? কেন? সেই প্রশ্ন শুধু তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিড়বিড় করে নিজমনে বলল মিমি, " অন্যরকম লাগছে...আচ্ছা কিছু হবে না। সব ঠিক আছে। নিশ্চয়ই কোনো কারনেই নিশান ভাই শৈলী আপুকে নিয়ে যাবে। অবশ্যই কোনো কারন আছে!"

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url