প্রেমের লাল ছোয়া পর্ব ৬



 বাড়ন্ত সকালটা একদম ঝকঝকে। আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, আর হালকা বাতাস গায়ে একরকম প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। নিশান আর শৈলী শহর ছেড়ে একটু দূরের এক জায়গায় রওয়ানা দিয়েছিল। এইতো একটু আগেই তারা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে পৌঁছেছে। তবে অবাক হওয়া শৈলী প্রায় কথা বলতে ভুলে গিয়েছে। নিশান নামক মানবটি তাকে এমন স্থানে এনেছে, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য যেন এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে রেখেছে চারপাশকে।

জায়গাটা ছিল সবুজে মোড়া, একদম নির্জন। বিস্তীর্ণ মাঠের ওপারে একটা স্বচ্ছ জলের হ্রদ, যেখানে আকাশের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। হ্রদের ধারে বড় বড় গাছ, পাতায় পাতায় রোদের আলোর খেলা। পাখিরা গাছের ডালে বসে মিষ্টি সুর তুলেছে, যেন প্রকৃতির কোনো অদৃশ্য শিল্পী তাদের দিয়ে এ সঙ্গীত বাজিয়ে নিচ্ছে।
চারপাশটা এতটা শান্ত যে, নিশান আর শৈলী হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছিল। শৈলী তো সব কিছু ভুলে গিয়ে চারপাশের সৌন্দর্য্য চোখ ভরে দেখছিল। বাতাসের তাজা গন্ধ, মাটির কোমল অনুভূতি, সবকিছু যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দিয়েছে। কিছু দূরে একটা ছোট কাঠের পুল দেখা গেল, যার ওপারে নরম ঘাসে ছাওয়া পথ বয়ে গেছে গভীর সবুজের দিকে। পুলের নিচ দিয়ে পানির ধারা বয়ে চলেছে কলকল শব্দে। সূর্যের আলো যখন পানির ওপর পড়ছে, তখন তার ছোট ছোট কণাগুলো হীরার মতো ঝলমল করছে।
পুলের কাছে আসতেই নিশান পা চালানো থামিয়ে দিল। তার দেখাদেখি শৈলীও স্বাভাবিক ভাবে থেমে মাথা নামিয়ে রাখল। চোখ রাখল পুলের নিচে বয়ে চলা কলকল শব্দে উচ্ছাসিত পানির দিকে।
নিশান শৈলীর পাশে দাঁড়িয়ে রেলিংয়ে হাত রাখল, তার চোখে যেন একটা গভীর প্রশান্তি। শৈলীও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, এমন জায়গায় আসার অভিজ্ঞতা তার খুব বেশি নেই। বাতাসে ভাসা গাছের গন্ধ, হ্রদের জলের শব্দ, দূরের টিলা থেকে আসা শীতল হাওয়া, সবকিছু যেন তাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাচ্ছে। নিশান ভাই যে তাকে এত সুন্দর একটা জায়গায় আনবে, সে কখনো কল্পনাও করেনি।
শৈলী ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“এত সুন্দর জায়গা... এই জায়গার খোঁজ কেমন করে জানলেন নিশান ভাই?”
নিশান হালকা হেসে নিঃসংকোচ অভিব্যক্তিতে বলল,
“তোর জন্যেই খুঁজেছি।”
অবাক হলো শৈলী। হাওয়ায় মিশে থাকা অদ্ভুত এক মিষ্টি গন্ধ শৈলীর মন ছুঁয়ে গেল। ঝিলিক স্পষ্ট চোখ চিকচিক করে উঠলো। যে মেয়েকে নিয়ে কখনো কেউ ভাবেনা, সেই মেয়েকে নিয়ে নিশান ভেবেছে! স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শৈলীর ঠোঁটের কোনায় অজান্তেই হাসির রেখা ফুটে উঠলো। মন ভরে উঠলো প্রশান্তিতে। আবারো চোখ মেলে আশেপাশে তাকালো সে। চারিদিকে ছড়িয়ে আছে সৃষ্টিকর্তার অপার সৌন্দর্যের নমুনা। এসব দেখে যে কারো মন ভালো হতে বাধ্য, মুখে হাসি ফোটাতেও বাধ্য।
পাখির কলকাকলি, হ্রদের জলে পড়া রোদের চিকচিক করা আভা, গাছের পাতায় খেলা করা বাতাসের দোল, সবকিছু যেন প্রকৃতির এক অনবদ্য আয়োজন। কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে এখন তার মন জুড়ে শুধুই নিশানের বলা কথাটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
"তোর জন্যই খুঁজেছি।"
অবিশ্বাস্য লাগছে শৈলীর। কেউ কখনো তার জন্য কিছু করেছে কি? এমন করে ভেবেছে কি? সে তো বরাবরই একটু চাপা স্বভাবের, নিজের মতো থাকা মেয়ে। ছোটবেলা থেকে সে শিখে এসেছে যে, কেউ তার জন্য ভাববে না, নিজেকেই নিজের মতো গুছিয়ে নিতে হবে। কিন্তু আজ নিশান…!
শৈলী আবারো চোখের তারায় বিস্ময় আর প্রশংসা একসঙ্গে মেখে নিশানের দিকে তাকালো। এই মানুষটা এত গম্ভীর, কথা কম বলে, অথচ তার মনের গভীরে কত কিছু লুকিয়ে থাকে! এমনকি নিজের অজান্তেই কি সে শৈলীর জন্য এতটা ভাবতে শুরু করেছে?
শৈলী একটু ধীরে নিঃশ্বাস নিলো। চোখ মেলে আবার প্রকৃতির দিকে তাকালো। আজ এই জায়গার সৌন্দর্য কেবল প্রকৃতির জন্য নয়, বরং কারও বিশেষ মনোযোগের জন্যও তার কাছে আরও সুন্দর লাগছে। নিশান পাশে থাকতেই যেন পরিবেশ আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে। একটা ছোট্ট হাসি আবারও খেলে গেল শৈলীর ঠোঁটে। মন ভরে উঠলো এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে।
হঠাৎ নিশান বলে উঠলো,
" তুই কথা বলতে শিখবি কবে?"
হঠাৎ নিশানের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে অপ্রস্তুত হলো শৈলী। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কথাটার মর্ম৷ কিন্তু সরল মনে নিশানের কথার মানেটা স্পষ্ট হলো না। প্রতিবারের মতো এবার মিনমিন করে জানতে চাইলো,
" মানে?"
নিশান এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আশেপাশে এক নজর ঘুরিয়ে এনে শৈলীর দিকে তাকালো। মুখে গম্ভীর ভাবটা বজায় রেখে স্বাভাবিক গলায় বলল,
" মানুষের মিনিমাম একটা সহ্য ক্ষমতা থাকে৷ সেটা যেকোনো ক্ষেত্রেই ৷ আমি জানতে চাই, তোর সহ্য ক্ষমতা ঠিক কতটা বেশি?"
শৈলীর ঠোঁট কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই নিশান আবার বলে,
" জীবনে এত বোকা হলে চলে না, হিমরূপা!"
চমকে স্তব্ধ হয়ে তাকালো শৈলী। তার চোখের এমন দৃষ্টি দেখে নিশানের ঠোঁটের কোণে একটা অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল। শৈলীর চোখ ফের বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। "হিমরূপা?" সে কি ভুল শুনেছে? না, নিশান তো একদম পরিষ্কারভাবেই তাকে এই নামে ডাকল! সে তো ঠিকই শুনেছে।
শৈলীর মনে হলো, কোনো এক শীতল হিমবিন্দু এসে তার বুকে ঠেকেছে, অথচ সেই শীতলতার ভেতরেও একধরনের অদ্ভুত উষ্ণতা লুকিয়ে আছে।
নিশানের চোখে তাকাতেই সে বুঝতে পারল, লোকটা মজা করছে না। বরং সে এক ধরনের হতাশা মিশিয়ে কথাটা বলেছে, যেন সত্যিই ভাবছে, শৈলী বড্ড বেশি বোকা!
শৈলী গলাটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
"আপনি হঠাৎ এমন বলছেন কেন, নিশান ভাই"
নিশান একটু কাছে এগিয়ে এল, চোখে সেই একই গম্ভীর দৃষ্টি, যেটা তার স্বাভাবিক অভ্যাসের মতো।
" তুই আসলেই বোকা। অনেক বোকা। তোর মতো গাধা আমি দুটো দেখিনি। আচ্ছা আমায় একটা কথা বল! তুই কেনো মায়ের উপর যুক্তিযুক্ত কথা বলতে পারিস না? অভদ্রতা দেখাতে চাস না, ইটস ওকে। কিন্তু ভদ্রতার সাথে যুক্তি নিয়ে কথা বলা তো যায়। যেটা সত্য সেটা কেনো তুই জোর গলায় বলতে পারিস না বলতো? মানুষ তখনই দমে যায়, তখনই নীরব থাকে যখন সে অপরাধ করে। কিন্তু তুই তো কোনো অপরাধ করিস নি! যখন তোর ওপর অন্যায়গুলো হয়, তখন তুই কেনো চুপ থাকিস? কেনো অপেক্ষা করিস যে কেউ এসে তোকে বাঁচাবে? নাকি অন্যায় সহ্য করতে, অত্যাচারিত হতে ভালো লাগে তোর?"
নিশান একটানা বলেই যাচ্ছে, আর শৈলী তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন তার মস্তিষ্ক এখনো ঠিকমতো প্রক্রিয়া করতে পারছে না নিশানের কথাগুলো।
নিশান বিরক্ত হয়ে বাজখাঁই গলায় আবার বলল,
" বল! চুপ করে থাকিস না!"
শৈলী এবার একটু গুছিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল।
" আপনি এভাবে বলছেন কেনো? আমি তো..."
নিশান তার কথা শেষ করতে দিল না,
" তুই তো কী? তুই কি জানিস, চুপ থাকা একধরনের অন্যায়? তুই কি জানিস, অন্যায় সহ্য করতে করতে একসময় মানুষ নিজেই নিজের শত্রু হয়ে যায়?"
শৈলী এবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
" নিশান ভাই, সব কিছুর সময় হয়, পরিস্থিতি হয়......!"
নিশান হেসে উঠল, তিক্ত এক হাসি।
"অসাধারণ! তুইও ওই সস্তা বুলি আওড়াচ্ছিস? সময়ের অপেক্ষা করতে করতে মানুষ নিজের জীবনটাই শেষ করে ফেলে, বুঝলি? সময় কখনো তোর জন্য বসে থাকবে না, তোকেই সময়কে ধরে আনতে হবে। সবকিছু পরিস্থিতির উপর ছেড়ে দিলে, একদিন দেখবি তোর জীবনের সিদ্ধান্তও অন্য কেউ নিয়ে নিচ্ছে। তখন কিছুই করার থাকবে না, কিছু বলারও না! প্রমান তো কম দেখছিস না!"
শৈলী এবার সত্যিই স্তব্ধ হয়ে গেল। নিশানের প্রতিটি শব্দ তার ভেতর কোথাও গিয়ে আঘাত করছে। কথাগুলো যে মিথ্যে নয়। এক মুহূর্তের জন্য শৈলীর মনে হলো যে নিশান তাকে আজ এত দূরে বাস্তবতা শেখানোর জন্য এনেছে।
"তোর কি মনে হয় না, তোর জীবনটা তোরই হওয়া উচিত?"
নিশানের কণ্ঠ এবার একটু নরম হলো।
শৈলী দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
"সবাই তো নিজের মতো জীবন কাটাতে পারে না, নিশান ভাই। কিছু বাস্তবতা থাকে, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে।"
নিশান কপালে ভাঁজ ফেলে তাকাল,
"বাস্তবতা মানেই কি অন্যায়ের সঙ্গে আপস? জীবন তোকে কতবার কাঁদিয়েছে, বল? কতবার চোখের পানি লুকিয়ে হেসেছিস? কতবার কষ্ট চেপে মুখে হাসির মুখোশ এঁকেছিস? এসব কি তোর জীবন চাওয়ার ফল? নাকি তোর অন্যায়ের বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর ফল?"
শৈলী এবার চোখ নামিয়ে নিল। নিশান তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"তোকে ভাবতে হবে, শৈলী। না ভাবলে, একদিন দেখবি.....নিজেকে চিনতেই পারছিস না।"
কিছুক্ষন নীরবতা। আশেপাশের হালকা বাতাস, গাছের পাতার মৃদু দোল, সব মিলিয়ে পরিবেশটাও যেন খানিক থমকে গেছে। নিশান নীরবে তার দিকে তাকিয়ে, অপেক্ষায়, শৈলী এবার কী বলে।
কিছুক্ষণ পর শৈলী নিঃশ্বাস নিয়ে নিচু গলায় বলল,
"আপনি সবকিছু এত সহজে বলেন, যেন সবকিছু হাতে ধরে বদলে ফেলা যায়। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সহজ নয়, নিশান ভাই।"
নিশান ভ্রু কুঁচকালো। নীরবেই এর মানে জানতে চাইলো। শৈলী ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ রইল, তারপর ধীর গলায় বলতে শুরু করল,
"জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো ছেড়ে দেওয়া যায় না। কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে, যা না মানলেও চলে, কিন্তু মানতে হয়। আমার জীবনটা কখনোই আমার নিজের ছিলই না, নিশান ভাই। আপনি তো জানেনই। আমার ছোটবেলা থেকেই শিখতে হয়েছে চুপ থাকা, শিখতে হয়েছে সবার কথামতো চলতে। আমি কখনো চাইলে কি পারতাম সব বদলে দিতে? পারতাম নিজের মতো করে কিছু গড়ে তুলতে? যদি পারতাম, তাহলে কি আজ আমি এভাবে থাকতাম?"
তার কণ্ঠস্বরে ক্ষীণ হতাশার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
"চেষ্টা করেছিস?"
নিশান এবার একদম স্থির গলায় বলল।
শৈলী এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর ফিসফিস করে বলল,
" চেষ্টার আগেই হেরে গেছি, নিশান ভাই। কারণ আমি জানতাম, শেষটা বদলাবে না।"
নিশান চোখ সরিয়ে নিল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
" শেষটা তোর হাতে না থাকলেও, পথটা তো তোর হাতে ছিল, শৈলী। তুই কখনো লড়াই করার চেষ্টা করিসনি, কারণ তুই ভয় পেয়েছিস।"
শৈলী মুখ শক্ত করে বলল,
"ভয়? ভয় না থাকলে কি মানুষ অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে নামে না? আমি জানি, আমার কথা শোনার কেউ নেই। এই যে আপনি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কথাগুলো শুনছেন। একটু হলেও তো আমাকে আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। মামনিও আমাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু বাকিরা? তারা তো বাড়ির কাজের লোকের থেকেও নিচু চোখে দেখে আমায়। আমি জানি, আমার অবস্থান বদলানোর সুযোগ নেই। তাহলে আমি শুধু শুধু লড়াই করে কী করতাম? শুধু নিজের ক্ষতি! "
নিশান এবার চোখ সরিয়ে সামনের সবুজ প্রকৃতির দিকে তাকাল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মিষ্টি রোদ মাটিতে পড়ছে, নরম বাতাস বইছে ধীর ছন্দে। কিছু দূরে পাহাড়ের পায়ে ছোট্ট ঝর্ণার স্রোত দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতি এতটা সুন্দর, অথচ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে এতটা দ্বিধাগ্রস্ত, এতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিশান বলল,
" তোর আসল সমস্যা কী জানিস? তুই নিজের দুর্বলতাগুলোই নিজের পরাধীনতা বানিয়ে নিয়েছিস। অথচ দুর্বলতা সবারই থাকে, কিন্তু সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্যই তো মানুষ লড়াই করে।"
শৈলী এবার একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে আসছিল। আজ এতদিন পর কেউ তাকে সত্যিটা শুনাচ্ছে, একদম নির্ভেজাল সত্য।
নিশান কিছুক্ষণ নীরব রইল। চোখের দৃষ্টিতে একরকম তীক্ষ্ণতা, অথচ কোথাও যেন একটা গভীর প্রশ্রয় লুকিয়ে আছে। যেন কিছু বলার জন্য কথা সাজিয়ে নিচ্ছে। শৈলী কিছু বলবে কি বলবে না, সেটা বুঝে ওঠার আগেই নিশান হঠাৎ বলে উঠল,
"তুই জানিস, তোর জন্য কেনো আমি এত কথা বলি?"
শৈলী কপাল কুঁচকালো। সেও তো জানতে চায়,
"কেনো?"
নিশান একদম স্থির হয়ে বলল,
"কারণ তোকে দেখলে আমার রাগ হয়।"
শৈলী অবাক হয়ে তাকাল। নিশানের গম্ভীর মুখ দেখে মনে হলো না, সে হালকা কিছু বলছে।
"রাগ হয়? আমার ওপর?"
নিশানের কণ্ঠ আরও দৃঢ় হলো।
" হ্যাঁ, রাগ হয়। ভীষন রাগ হয়। মাঝে মাঝে তোকে থাপ্পড় মারতেও মন চায়।"
শৈলী চোখ পিটপিট করে তাকাল। সরল মনে জানতে চাইলো,
" কেনো, নিশান ভাই?
"কারণ তুই কিছুই বুঝিস না, আর বুঝলেও সেটা মানতে চাস না।"
শৈলী ভ্রু কুঁচকালো।
"আমি কিছু বুঝতে চাইছি না বলেই কি আপনি এমনভাবে কথা বলছেন?"
নিশান একটু হেসে মাথা ঝাঁকালো।
"আসলে তুই বুঝিস, কিন্তু স্বীকার করিস না।"
শৈলী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। নিশানের কথা কেবল কথার কথা নয়, এর পেছনে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেটা কী? সে কি কিছু আন্দাজ করতে পারছে? নাকি সে নিজেই ভয় পাচ্ছে কিছু একটা বুঝতে?
নিশান আবারো বলে,
"তুই নিজেকে বুঝতে চাস না, তোর নিজের কদর করতে চাস না! তুই এমন একটা মেয়ে, যাকে দেখলে মনে হয়, তুই হয়তো আকাশ ছুঁতে পারবি, অথচ তুই নিজেই নিজের ডানা ভেঙে বসে থাকিস! এটা কি সহ্য হয়!"
শৈলী নড়েচড়ে দাঁড়াল। নিশানের চোখের দৃষ্টি এতটাই গভীর যে, তার ভেতরের গুছিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো এক মুহূর্তে টলমল করে উঠল।
নিশান এবার একধাপ এগিয়ে এল।
" আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবি?"
শৈলী মাথা তুলে ডানে ঘাড় এলিয়ে দিল,
" বলুন....পারলে উত্তর দেব।"
নিশান জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচের ঠোঁট কাঁমড়ে কিছুক্ষণ ভাবল। চোখ বন্ধ করে যেন ভেবে নিল আসলে কথাটা বলার সঠিক সময় এটা কিনা।
শেষে মনের কাছে হেরে গিয়ে শৈলীর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ বলতে থাকলো,
" তুই নিজেও জানিস, আমি কখনো কারো বিষয়ে নাক গলাই না। কথা বলতে ইচ্ছে করে না আমার। পেটের মধ্যে বোমা ফাটালেও আমি এক মিনিটের বেশি কথা বলতে পারি না। হয়তো তুই নিজেও মনে মনে আমাকে কঠিন হৃদয়ের মানুষ বলে দাবি করিস। আমিও তাই মানি এবং তাই জানি। আমি খুব ভালো করেই জানি যে আমি কখনো অনুভূতি বুঝিনা। অন্য কারো অনুভূতি তো দূরে থাক, আমি নিজের অনুভূতিটাই ভালো করে বুঝতে পারিনা। আসলেই খুব শক্ত মনের আমি। কিন্তু......!"
কিছুক্ষণ থামলো নিশান। উদগ্রীব হয়ে চেয়ে থাকা শৈলীর ডাগরআঁখি জোড়ার দিকে তীর্যক দৃষ্টি ফেলে ভ্রু কুঁচকে বলল,
" তাহলে তোর অনুভূতি আমি কীভাবে বুঝতে পারি?"
চোখের বিস্তৃতি বাড়লো শৈলীর। নিশান এখনো স্বাভাবিক। যেন সে একদম নিত্যদিনের কোনো সমস্যার কথা বলছে। নিশান চোখ ছোট করে আবারো কৌতূহল আগ্রহ নিয়ে বলল,
" আমি তোর অনুভূতি গুলো কীভাবে নিজে অনুভব করতে পারি বলতো? যেখানে আমি নিজেই নিজের অনুভূতি বুঝতে পারি না, সেখানে আমি তোর কষ্টগুলো, তোর যন্ত্রণা, তোর আবেগ গুলো কীভাবে বুঝি?"
শৈলী মন্ত্রমুগ্ধের মতো দুপাশে মাথা নাড়িয়ে নীরবে বোঝালো, " আমি জানিনা।"
নিশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তার ভেতরে অস্বস্তি এবং বিভ্রান্তির একটি আবর্ত সৃষ্টি হতে থাকল। তার মুখে একটা গভীর ভাব ফুটে উঠলো, যেন তার মনের মধ্যে কোনো কিছু ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে, কিন্তু সে নিজেই পুরোপুরি বুঝতে পারছে না।
"তোর অনুভূতি আমি কীভাবে বুঝতে পারি?"
নিশান আবারও এই প্রশ্নটা শৈলীর দিকে ছুঁড়ে দিল।
কিন্তু তার কথায় কোনো আক্রোশ ছিল না, বরং যেন শৈলীকে বোঝানোর চেষ্টা ছিল যে, সে নিজেই বিভ্রান্ত। চোখে কোনো এক ধরনের কষ্ট এবং একাকিত্বের ছাপ।
নিশান হালকা বিরক্তি ও সন্দেহের সুরে বলতে থাকলো,
" আমি জানিনা, যতটুকু আমি অনুভব করি, সেটা তো আমার নিজেরও একটা বিস্ময়। আমার কাছে সব কিছু কঠিন, মানুষের মনের গভীরে ঢোকা আমার জন্য একেবারে অসাধ্য। কিন্তু তুই যখন কাছে থাকিস, কিছু একটা হয়, কিছু একটা অনুভব করি। তুই.... তুই কেনো এই রকম করছিস শৈলী? আমি কি আসলেই কিছু অনুভব করছি?"
নিশানের মুখাবয়ব ভেসে ওঠা সংকোচ আর দ্বিধায় এক অদ্ভুত প্রভাব সৃষ্টি হলো। একদিকে সে নিজের অনুভূতিকে বুঝতে পারছিল না, অন্যদিকে শৈলীর কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য বুকের ভেতর চাপ ছিল। একটা অদৃশ্য সেতু তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু নিশান জানত না সেটা ঠিক কোথায় যাবে বা কেমন হতে চলেছে।
শৈলীর নীরবতা গভীর হতে দেখে নিশান শেষমেশ আবারো বলল,
" এটা আমার জন্য খুব কঠিন, শৈলী। এরকম অনুভূতির সাথে আমি পরিচিত নই। তোর কাছ থেকে আমি এমন কিছু প্রত্যাশা করতে চাই, যা আমি নিজেও বুঝি না। আমার মধ্যে মাঝে মাঝেই একটা নতুন অনুভূতি উঁকি দেয়, কিন্তু আমি জানি না সেটা কি। এর নাম জানিনা। কারণটাও বুঝতে পারি না। শুধু নিজের অস্থিরতাটা বুঝতে পারি।"
শৈলী কোনো উত্তর দিল না। নীরবে নিভৃতে কি যেন চিন্তা করতে থাকলো। নিশান নিজেই বলে চলল,
" আমি তোকে অনুভব করি, শৈলী। তুই বুঝিস না, কিন্তু আমি অনুভব করি। তোর নির্বাক দৃষ্টি, তোর চুপচাপ শ্বাস ফেলা, সব বুঝি। তোর কষ্টগুলো, তোর ভয়গুলো, তোর নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধগুলো, সব অনুভব করি। কিন্তু কেনো? করতে তো চেষ্টা করি নি, চাইও নি।"
শৈলী থমকে রইল। তার চোখের সামনে যেন সবকিছু ধোঁয়াশার মতো হয়ে যাচ্ছে। নিশানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর তার কানে ধাক্কা দিচ্ছে।
" আচ্ছা, ওসব বাদ দে। আমি যেমন, তেমনভাবেই এর একটা সমাধান বের করব। কীভাবে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হয়, তার চেষ্টা করব আমি। কিন্তু....আমি চাই না, তুই এমন থাক। আমি চাই, তুই নিজের জন্য দাঁড়াস। নিজেকে ভালোবাসতে শিখিস। মানুষকে না পারিস, নিজেকে তো বোঝাতে পারিস যে তুই কম না! আমি তোকে এজন্যই বলি, শৈলী। কারণ আমি জানি, তোর ভেতরে যে আলো আছে, সেটা নিভে গেলে আমারও সহ্য হবে না।"
নিশান থেমে গেল। শৈলী চোখের পলক ফেলল না। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে, নিশানের কথাগুলো তার মনে এতটা গভীরে গিয়ে লাগছে যে, সে ঠিক বুঝতে পারছে না, এটা রাগ, অভিমান, নাকি অন্যকিছু। তার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
নিশান শৈলীর চোখে চোখ রেখে মৃদু গলায় বলল,
" একদিন তুমি নিজেকে আমার চোখ দিয়ে দেখবে, হিমরূপা। সেদিন বুঝবে, আমি কেন এতবার তোমায় জাগাতে চেয়েছি।"
শৈলী এবার হঠাৎ করে ঠোঁটের কোণে হাসির সুক্ষ্ম রেখা টানল। এরপর নিশানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
" আপনাকে একটা কথা বলব, নিশান ভাই? "
নিশান নীরবে অনুমতি দিলে, শৈলী নির্বাক প্রকৃতির দিকে চোখ রেখে প্রশান্তির শ্বাস ফেলে বলে,
" আমি আপনাকে খুব বিশ্বাস করি। এতটাই বিশ্বাস করি যে আপনি যদি কখনো আমায় একটা ভয়ানক মহাসমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বলেন, আমি নির্দ্বিধায় সেখানে ঝাঁপ দেব। একটা কারণও জিজ্ঞেস করবো না। জিজ্ঞেস করবো না ওখানে পড়ে গেলে আমি বাঁচবো কিনা। কারণ আমি জানি...যা হবে আমার ভালোর জন্যই হবে। আমি আপনাকে খুব বিশ্বাস করি নিশান ভাই, নিজের থেকেও বেশি।"
নিশান অনুভূতিশূন্য অভিব্যক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্ঠুর দানবের মতো প্রশ্ন করে বসলো,
" এত বিশ্বাস করিস কেনো আমায়?"
হাসলো শৈলী। অমায়িক সেই হাসি। বিষাদ যেথায় স্পষ্ট। চোখে হালকা আর্দ্রতা ঝিলমিল করতে লাগল, যেন কোনো গভীর অনুভূতি নীরবে কাঁপছে।
"জানিনা। তবে..."
শৈলী কথা বলতে বলতে কিছুটা থামল। তার চোখে যেন এক অদৃশ্য বেদনা , যা তাকে শান্তভাবে, কিন্তু গভীরভাবে অনুভব করতে বাধ্য করেছে। তার ঠোঁটের কোণে এক মৃদু হাসি, কিন্তু সেই হাসি যেন খুবই বিষাদময়। সে নিশানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে বলল,
"আপনি হয়তো মনে করেন, আমি খুব সরল, খুব বোকা। কিন্তু আমি জানি না কেন, যখনই আপনার কাছে থাকি, কোনো অজানা শক্তি আমাকে এখানে টানে। আপনি কেন এমন, কেন এত কঠিন, আমি জানি না। তবে সত্যি বলছি, আপনার কাছ থেকে আমি এমন কিছু অনুভব করি, যেটা অন্য কোথাও কখনো পাইনি। আপনার মধ্যে এমন কিছু আছে, নিশান ভাই, যা... যা আমাকে খুব ভরসা দেয়।"
শৈলী একটু যেন লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করল তার মনের অস্থিরতা। নিশানের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে সে বলে যেতে থাকল,
" আপনি হয়তো শুনলে হাসবেন... কিন্তু এটা সত্যি যে যখন বাড়িতে বড়মা আমায় বকে, তখন আমি আপনার কথা স্মরণ করি। অন্যরা নিজেদের বাবা মাকে স্মরণ করে আর অনাথ এই আমি ভাবতে থাকি, আপনি কখন আসবেন। আপনি আসলেই তো কেউ আমায় আর কিচ্ছু বলতে পারবে না। যখনই আপনার মামাতো বোন সীমা বাড়িতে এসে আমায় অত্যাচার করে, সেই সময়টাতেও আমি আপনার কথা স্মরণ করি। তখনও ভেবে নিই আপনি কখন আসবেন। আপনাকে এতটাই বিশ্বাস করি যে কখনো কোনো বিপদে পড়লেই আপনার কথা মনে পড়ে। কী করবো বলুন? আপনি তো আমার মাথায় তুলেছেন। আপনিই তো আশকারা দিয়েছেন। আপনিও যদি বড় মার মত আমার সাথে এমন আচরণ করতেন, তাহলে তো আমি মোটেই আপনার দিকে চোখ তুলে তাকাতাম না। তবে এটা সত্যি.... আপনি এবং মামনিও যদি আমার আমায় পর ভেবে নিতেন, তাহলে আমি আর বেঁচে থাকতে পারতাম না। কবেই ম'রে যেতাম!"
নিশান শৈলীর কথাগুলো এক এক করে শুনছে। এমন কথা শুনে সে বাকি প্রেমিকদের মত তৎক্ষণাৎ শৈলীর ঠোঁটে হাত রেখে অস্থির হয়ে বলল না,
"এমন কথা বলোনা। নিজের মৃত্যুর কথা বলোনা প্রিয়তমা। আমি সহ্য করতে পারি না।"
বরং নিশান আবারো কঠিন পাষাণ পুরুষের পরিচয় দিয়ে চোখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। কিন্তু শৈলীর কথা তার মনে গেঁথে যাচ্ছে, যেন প্রতিটি শব্দ গভীরে প্রবাহিত হচ্ছে, তার নিজের অজানা অনুভূতির সাথে মিশে যাচ্ছে।
শৈলী একটা ঢোক গিলে বলল,
" আপনি আমাকে এমনভাবে চিনেছেন, যে আমি এখন নিজেও জানি না, আমি কে। হয়তো আপনি আমার অজানা দিকগুলো দেখেছেন, আর তাই আমি আপনার মধ্যে এমন এক বিশ্বাস খুঁজে পেয়েছি, যা কখনো কারও মধ্যে ছিল না।"
শৈলীর কথা শেষ হতে না হতেই নিশান অল্প সময়ের জন্য নির্বাক হয়ে রইল। শৈলী বলেই চলেছে, যেন তার মুখ থেকে কথা বেরিয়ে আসা খুব জরুরি। কিন্তু নিশান, সে এক মুহূর্তের জন্যও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। শৈলী অনুভব করতে পারল, তার কথা যেমন নিশানের কানে পৌঁছাচ্ছে, তেমনি নিশান যেন তার হৃদয়ে এক অদৃশ্য অনুভূতি রোপণ করে দিচ্ছে। নিশানের মুখে কোনো ভাব নেই, কিন্তু তার চোখগুলো যেন গভীর কষ্ট এবং অনিশ্চিত ভাবনা দিয়ে পূর্ণ হয়ে গেছে।
নিশান কিছুক্ষণ নীরব থেকে, তার চোখে কিছুটা অভ্যস্ত দৃষ্টি এনে, ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসি ফুটিয়ে বলল,
"তোর এই বিশ্বাস... তুই জানিস না তোর বিশ্বাস কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। তুই বিশ্বাস করিস, কিন্তু আমি কি কখনো জানবো তোর সেই গভীর অনুভূতি? যদি কখনো ভুল প্রমানিত হয়?"
শৈলী অস্থির হয়ে নিশানের দিকে তাকাল। তার কষ্ট, তার হতাশা সব কিছু যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু নিশান তার কোনো কথা মনে রাখছিল না। তার কঠিন বাহুডে কষ্টের গুঞ্জন আছেই, তবে সেই কষ্ট কীভাবে সহ্য করতে হবে, সেটা বুঝতে পারছিল না।
নিশান আবারো তিক্ততার সাথে বলল,
" মানুষের প্রতি এত বিশ্বাস ভালো নয়, হিমরূপা! "
শৈলী মাথা নামিয়ে খানিক মলিন হেসে বলে,
" অন্য মানুষ আর আপনি এক নন, নিশান ভাই!"
নিশান কিছুক্ষণ চুপ করে শৈলীর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ করে একপাশে এগিয়ে গেল। শৈলী অবাক হয়ে দেখল, সে কাছের একটা ছোট পাহাড়ি ঢালের দিকে হাঁটছে। সেখানে নরম সবুজ ঘাসের মাঝে ফুটে আছে অপূর্ব কিছু নীলচে-বেগুনি ফুল।
শৈলী তাকিয়ে দেখল, নিশান একটা নীলকণিকা ফুল তুলছে। চমৎকার, গভীর নীল রঙের ছোট্ট ফুল, যেন আকাশের কোনো এক অংশ ছিঁড়ে এনে মাটিতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিশান খুব যত্ন করে ফুলটা হাতে নিল, তারপর ধীর পায়ে ফিরে এসে শৈলীর সামনে দাঁড়াল।
শৈলী অবাক হয়ে বলল,
"ফুলটা কেনো ছিঁড়লেন, নিশান ভাই?"
নিশান একপলক তার দিকে তাকাল, তারপর শান্ত গলায় দুষ্টুমি করে বলল,
"হিমরূপার চুলে গুঁজে দেয়ার জন্য।"
শৈলী হতবাক হয়ে রইল। নিশান তার হাতের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, যেন নীরবেই বলছে, "ফুলটা নাও"। কিছুক্ষণ দ্বিধা করার পর শৈলী হাত বাড়িয়ে নিল। নরম পাপড়িগুলোর স্পর্শে সে একটু চমকে গেল, যেন এতদিন পর প্রথমবার কোনো ভালোবাসামাখা কিছু পেয়েছে।
নিশান তাকিয়ে বলল,
"এই নীলকণিকা ফুল জানিস কেমন? দেখতে কোমল, কিন্তু এর শিকড় মাটির গভীরে থাকে। ঝড় এলেও সহজে উপড়ে যায় না। তোরও এমন হওয়া উচিত, শৈলী। নরম হতে পারিস, কিন্তু ভেতর থেকে শক্ত থাকতে শিখতে হবে।"
শৈলী কিছু বলল না। শুধু নীল ফুলটার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণে একফোঁটা পানি চিকচিক করে উঠল, কিন্তু সে সেটা মুছল না। কারণ আজ সে প্রথমবার অনুভব করল, কেউ তার দুর্বলতাকে স্বীকার করেও তাকে অস্বীকার করেনি। বরং তাকে আরও শক্ত হতে শিখতে বলেছে।
~~~★
বেলা বেশ গড়িয়েছে। নাসিরুল তালুকদার নিজের ঘরে বসে পেপার পড়ছেন, আলো-আঁধারি ঘরটাতে তার মুখাবয়বটা একেবারে শান্ত। তিনি একটু আগেই তার ছোট ভাই শরিফুল তালুকদার কে দেখে এলেন। প্যারালাইচড ভাইকে দেখে তিনি প্রতিবারই অশ্রুসিক্ত হয়েছেন। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গিয়েছে শৈলীর হাসি মাখা মুখটা। সে কি আদৌ নিজের দায়িত্ব গুলো পালন করতে পারছে? ছোট ভাইকে দেওয়া দায়িত্ব হিসেবে কি শৈলীকে ঠিকঠাক দেখভাল করতে পারছে? পারছে না! সে মোটেই পারছে না। এটা তার জানা। কিন্তু সে যে নিরুপায়! নাসিরুল তালুকদারের এখনো মনে পড়ে, সে তার প্যারালাইজড ছোট ভাইয়ের মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো করে লালন পালন করার কথা দিয়েছিল। সে মোটেই এই কথা রাখতে পারেননি। যতবারই তিনি শরিফুল তালুকদারের কাছে গিয়েছেন ততবার এই প্রতিশ্রুতি তার মস্তিষ্কে জলন্ত হয়ে উঠেছে।
অতীত নিয়ে নাড়াচাড়া করা নাসিরুল তালুকদার হঠাৎ করেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে কেঁপে উঠলেন, চমকে গেলেন। নিজেকে স্বাভাবিক করে চোখে চশমা লাগিয়ে স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
" এসো! "
লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পড়া খাদিজা মুখ গম্ভীর রেখে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। মুখে তার বেজায় বিষাদের ছায়া। কোনো রকম কথাবার্তা ছাড়াই তিনি ধপ করে চায়ের কাপটা শব্দ করে রাখলেন নাসিরুলের পাশে থাকা টেবিলের উপর। নাসিরুল সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন নিজের স্ত্রীর দিকে। খানিক তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললেন,
"সমস্যা কী তোমার?"
বাজখাঁই গলায় ক্ষেপে উঠলেন খাদিজা। চোখ গরম করে দাঁত খিঁচিয়ে দ্রুত বলতে থাকলেন,
" সমস্যা! সমস্যা আমার নয়, সমস্যা হলো আমাদের। তুমি কি শুরু করেছো হ্যাঁ? কতবার করে বললাম তোমার ওই ছোট ভাইয়ের অ'প'য়া মেয়েটাকে এখান থেকে বের করো। যত দ্রুত সম্ভব এই বাড়ি থেকে তাকে তাড়িয়ে দিতে বললাম আমি তোমায়। তুমি আমার কথা শুনলে? কত কষ্ট করে একটা পাত্রপক্ষ জোগাড় করলাম। শেষমেষ তোমার ওই ভাইয়ের মেয়ে আমার ছেলেটাকে দিয়ে পাত্রপক্ষ তাড়িয়ে দিল! কত বড় কলিজা ওই মেয়ের। এগুলো কি হচ্ছে? আমি এগুলো কেনো সহ্য করব? ওই মেয়েকে আমি আর খাওয়াতে পারব না, আমি আর পড়াতে পারবো না।!"
নাসিরুল তালুকদার নিজের স্ত্রীর মুখে আবারও সেই কথাগুলো শুনে এবার পেপার ভাঁজ করে টেবিলে রাখলেন। এরপরে দুই হাত মুঠ করে শান্ত গলায় বললেন,
" পড়াশোনাটা শেষ হতে দাও ওর। আর কিছুদিনের ব্যাপার তো। ও একটা মেয়ে। শৈলী ছেলে নয় যে সারা জীবন এই বাড়িতে পড়ে থাকবে। অবশ্যই বিয়ে করবে। বিয়ে করলে মোটেই তোমার এই বাড়িতে আসবে না। আর চাইলে আসতেও পারে। এটা ওর বাপের বাড়ি। তুমি আবারো ভুলে যাচ্ছ যে এই বাড়িটা আমার নামে লেখা নয়। এই বাড়ির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আমার নামে লেখা। আর তুমি যে বারবার শৈলীকে নিয়ে এসব কথা বলছো, এটা কি ঠিক? ও নিজের বাপের টাকায় চলে, নিজের বাপের টাকায় পড়ে!"
খাদিজা তালুকদার বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরালেন। নাসিরুল আবারও বললেন,
" আর তুমি কি বলছো? তোমার ছেলে কি এমন যে কেউ তাকে বশ করতে পারবে? তোমার ছেলে অত ভালো হলে এতদিনে বিয়েটা দিতে পারতে। সেটাও তো পারলে না। ওর বয়সী সবার বিয়ে হয়ে এক বাচ্চার বাপ হয়ে গিয়েছে। আর তুমি তোমার ছেলেকে এখন পর্যন্ত বিয়ে দিতে পারলে না। আবার তোমার ছেলে, তোমার ছেলে করছো? তোমার ছেলে কে বশ করার মত কোনো মেয়ে এখনো জন্ম নেয়নি। নইলে এতদিনে হয়েই যেত। কোনো মেয়ে যদি তোমার সুযোগ্য ছেলেকে বশ করতে পারে তাহলে আমার থেকে বেশি খুশি আর কেউ হবে না।"
খানিক থেমে তিনি আবারো বললেন,
" নিশান এ বাড়ি থেকে পাত্রপক্ষ তাড়িয়ে দিয়েছে, এই বিষয়ে আমি ওকে অনুমতি দিয়েছি। এ বাড়িতে পাত্রপক্ষ এখন আসবে না। সময় হলে আমি নিজে গিয়ে পাত্রপক্ষ আনব। তোমাকে এ ব্যাপারে নাক গলাতে না করেছি খাদিজা।"
খাদিজা এবার চরম বিরক্ত হয়ে বললেন,
" আমি তো তোমাকে বারবার বললাম যে সীমার সাথে নিশানের বিয়েটা দিয়ে দিতে। সীমা কত ভালো একটা মেয়ে, অনেক বুঝদার একটা মেয়ে। সংসার সামলাতে পারবে। নিশানকেও সামলাতে পারবে। আর একবার বিয়েটা হয়ে গেলে নিশানও বাধ্য হবে সংসার করতে। একটু সময় লাগবে। কিন্তু শেষে তো দুজন এক হয়ে ভালো করে সংসারটা করতে পারবে। দুজনকে পাশাপাশি কি সুন্দর মানায়!"
শেষের কথাটা একটু আহ্লাদের সুরে বললেন খাদিজা।
নাসিরুল এবার দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলেন,
" আমার ছেলের অমতে আমি কখনোই তাকে বিয়ে দেবো না। তোমার ওই ভাগ্নিকে নিশান মোটেই পছন্দ করে না। ওই মেয়ের চালচলন আমারও পছন্দ নয়। এই বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্য নয় সে।"
খাদিজা এবার ক্ষেপে উঠলেন। টেনে টেনে তাচ্ছিল্যের সুরে বলতে থাকলেন,
" হ্যাঁ! এখন তো এটাই বলবে। এই বাড়িতে তো আমার ভাগ্নি একদম যোগ্য নয়। এ বাড়িতে থাকার জন্য তো তার যোগ্যতা নেই। এই বাড়িতে থাকার জন্য তোমার ওই ছোট ভাইয়ের মেয়ের যোগ্যতা আছে। শৈলীর মতো ছোটলোকেরা এ বাড়িতে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াতে পারে। এটাই তো বলবে তুমি, তাই না? ওই মেয়েটা.... তুমি জেনে রাখো। ওই মেয়েটাই একদিন আমাদের বাড়িতে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ওই মেয়েটাই আমাদের কাছ থেকে আমাদের ছেলেকে ছিনিয়ে নেবে৷ তুমি দেখে থেকো।"
নাসিরুল এবার ভ্রু কুঁচকে বললেন,
" ঝেরে কাশো! কী বলতে চাও?"
খাদিজা এবার ঠোঁট চেপে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
" শুনতে চাও? শোনো তবে, গত রাতে আমি নিশান আর তোমার আদরের ভাতিজিকে একসাথে ছাদে দেখেছি। অত রাতে কী করছিল ওরা? নিশান নিশ্চয়ই বিনা কারনে ছাদে যায়নি? ওই ছোটলোকটাই ডেকেছিল। ও এখন নিশানকে পটিয়ে এ বাড়িতে স্থায়ীভাবে ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টায় আছে! ছিঃ! মেয়েটার কি নিচু চিন্তাভাবনা! আর আমরা গাধার মত কিছু না বুঝে চুপচাপ আছি!"
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url