প্রেমের লাল ছোয়া পর্ব ৭

 


একলা ঘরে মনে পড়ে

পথে পথম দেখার ছবি যে,
ভয় জড়ানো সিহরনে,
লেখে প্রেমের চিঠি যে।
হাত বাড়ানোর এ সময়
পাখা মেলে না জানি যাবো কোথায়,
তেরে রারা রুরু, মন উড়ু উড়ু
প্রেম হলো শুরু মনে হয়,
তেরে রারা রুরু, মন উড়ু উড়ু
প্রেম হলো শুরু মনে হয়।
ঝিরি ঝিরি স্বপ্ন ঝরে,
দুটি চোখের সিমানায়❞
মনের খুশিতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে গান গেয়ে চলেছে মিমি। তার মন এখন অনেক ফুরফুরে। অবশ্য হওয়ারই কথা। একটু আগের ঘটনায় অন্য কেও অপ্রস্তুত হলেও তার জন্য তো ছিল মোক্ষম সুযোগ আর অনাকাঙ্ক্ষিত তবে আকাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়া।
আজ রবিবার৷ প্রতিদিনের মতো তাড়াহুড়ো করে নিশান অফিসের জন্য বেরোতে গেলে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। আবার সেই সময়ে নিজ থেকে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মিমি উপরে উঠছিল এবং একে অপরকে লক্ষ্য না করায় যা ঘটার তাই ঘটলো। নিশানের শক্তপোক্ত বাহুর সাথে মিমি জোরে এক ধাক্কা খেলো এবং পড়ে যেতে নিলে স্বভাবসুলভ ভাবে নিশান বাঁচানোর জন্য মিমের বাহু ধরল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিশান বিষয়টা বুঝতে পেরে মিমিকে ছেড়ে দিল এবং কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শুধু ছোট করে বলল,
"দেখে শুনে হাঁট! পড়ে যাবি তো!"
এরপর মুখ গম্ভীর করে গটগট করে নিজের মতো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। অথচ এই দিকে আবেগের বয়সে থাকা মিমি মনে করলো নিশান তাকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে আবার নিজেই ধরেছে, হয়তো উদ্দেশ্য ছিল তাকে কাছে টেনে নেয়া।
নিজের মতো করে ভেবে মিমি খুশিতে, আবেগে আপ্লুত হয়ে দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয়। দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ঠেস দিয়ে জোরে জোরে হাঁপাতে থাকে এবং বড় বড় করে শ্বাস নেয়। মুখে হাসি স্পষ্ট। খুশিতে কলিজাটা যেন বের হয়ে আসতে চাইছে। বুকের উপর হাত রেখে জোরে জোরে শ্বাস টানে মিমি।
আজ অনেক কাছে গিয়েছে সে নিশানের। ভেবেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। সে এতটাই উত্তেজিত হয়ে গেছে যে আর কোনো কিছু না ভেবে মুখ খিঁচে বিছানায় ঝাঁপ মারে এবং কোলবালিশ বুকে টেনে নিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে থাকে।
একটু আগে গোসল সেড়ে আসা রিমির কিছু ওড়না বারান্দায় মেলে দিতে গিয়েছিলেন রাশিদা তালুকদার। রিমি একটু আগেই নিজের বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘুরতে গিয়েছে। তবে মিমি বাসায় রয়ে গেছে। বারান্দার জানালা থেকে নিজের মেয়ে মিমির এরকম অদ্ভুত আচরণ দেখে থমকে গেলেন রাশিদা। তিনি নিঃসন্দেহে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী একজন মহিলা।এই বয়সটা তিনিও পার করে এসেছেন। তাই এটুকু বয়সে একটা মেয়ের আবেগ বুঝতে তার সময় লাগবে না। ভেজা কাপড় হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিমির কার্যকলাপ দেখলেন রাশিদা তালুকদার। কিছু একটা ভাবলেন নীরবেই। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি তার মেয়েদেরকে খুব আদরের যত্ন করে বড় করেছেন। মা মেয়ের মধ্যে কোনরকম গোপনীয়তা রাখেননি তিনি। ছোট থেকেই শিখিয়েছেন মা-বাবাকে নিজের সমস্ত বিষয়গুলো খুলে বলতে আর তাই রাশিদা তালুকদার এই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে আজ রাতেই মিমিকে তার এই অদ্ভুত আচরণ বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন।
শুধু আজই নয়, রাশিদা তালুকদার অনেকদিন ধরেই মিমির এমন অদ্ভুত আচরণ লক্ষ্য করেছেন। অথচ রিমির মধ্যে এমন স্বভাবটা দেখতে পাওয়া যায় না। এমন অদ্ভুত স্বভাব কেনো হতে পারে সেটা তিনি আন্দাজ করতে পারছেন। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য খোলামেলা কথা বলতে হবে মিমির সাথে।
~~★
বারান্দার ভেজা চুলগুলো চারপাশে ছড়িয়ে দিয়ে চেয়ারে "চাঁদের পাহাড়" নিয়ে বসে আছে শৈলী। গতরাতেই সে নিশিপদ্ম উপন্যাস টা শেষ করেছে আর আজ চাঁদের পাহাড় শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই গোসল ছেড়ে দ্রুত বারান্দায় বই হাতে নিয়ে বসে পড়েছে। একটু আগে নিজের বাবা শরিফুলকেও দেখে এলো সে। এভাবে নিজের বাবাকে অচল হয়ে পড়ে থাকতে দেখাটা যে কতটা কষ্টকর সেটা সে খুব ভালো করেই জানে।। মাঝে মাঝে নিষ্ঠুর মনটা বলে, বাবা যদি আর কখনো নিজ পায়ে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে এভাবে কষ্ট সহ্য করে পৃথিবীতে মায়ায় আটকে থাকার দরকার নেই। অথচ মুহূর্তের মধ্যেই সন্তানের পিতার প্রতি ভালোবাসার টানে নিজেকে ধিক্কার জানায় শৈলী। এমন জঘন্য চিন্তা কে দূরে ফেলে মনে মনে আবারো ভেবে নেয়, থাকুক! এভাবেই থাকুক! অচল হয়ে পড়ে থাকলেও চোখের সামনে তো আছে। এটাই অনেক।
বয়সের ভারে খানিক নুইয়ে পড়া নাসিরুল তালুকদার হাঁটু ব্যাথার কারনে অফিসে যাননি। তাই নিশানকেই দ্রুত অফিসে পাঠিয়েছে। এই মাঝ দুপুরে একটু বিশ্রাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন আর এই ফাঁকেই খাদিজা তালুকদার খুব কৌশলে সতর্কতার দৃষ্টি ফেলে শৈলীর ঘরে প্রবেশ করে। দরজার খটখট শব্দে মাথা তুলে তাকায় শৈলী। বারান্দার পর্দার মধ্য দিয়ে গাঢ় সবুজরঙা শাড়িটা দেখে পুরো শরীর কেঁপে ওঠে তার। এই শাড়ি পরিহিত মহিলাটি যে খাদিজা তালুকদার, সেটা আর বুঝতে বাকি নেই। খাদিজা ভেতরে ঢুকেই ঘরের চারপাশে তাকিয়ে শৈলীকে খুঁজলে শৈলী দ্রুত বইয়ের ভেতরে বুকমার্ক ঢুকিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে আসে।
একটা শুকনো ঢোক গিলে হাত কচলাতে কচলাতে শৈলী মাথা নিচু করে রাখে। দুপুরে খাওয়ার পর নিজ দায়িত্বে নিজের সহ বাড়ির সবার প্লেট ধুয়ে ডাইনিং টেবিলটা গুছিয়ে ঘরে এসেছে শৈলী। তাই এই সময় খাদিজা তালুকদারের তার ঘরে আগমনটা খুব একটা সুবিধার বলে মনে হয় না, এটা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। কারণ শৈলী তো সব কাজ করেই এসেছে। তবুও নিজের দুর্বল মনটাকে বোঝাতে পারল না সে। হয়তো কোনো ভুল হয়েছে- এই ভেবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে বলল,
" কিছু বলবে বড়মা?"
খাদিজা আশেপাশে তাকিয়ে শৈলীর ঘরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করল। মেয়েটা নিঃসন্দেহে খুব গোছালো। তিনি কখনোই শৈলীর ঘর অগোছালো পাননি। ভেবেছিলেন আজ ঘরে এসে একটু ঘরের কাজের জন্য খোঁটা দেবেন। কিন্তু ঘরের অবস্থা বেশ সুন্দর হওয়ায় তিনি কিছু বললেন না। অজুহাত ভুলে গিয়ে কোনোরকম ভনিতা না করেই সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন,
" সেদিন রাতে নিশানের সাথে কী করছিলি ছাদে?"
চকিত দৃষ্টিতে খাদিজার দিকে তাকালো শৈলী। কচলাতে থাকা হাত দুটোও স্থির হয়ে রইলো। চোখে বিস্ময় একদম স্পষ্ট। খাদিজা যে সেই রাতে তাদেরকে দেখে ফেলবে এটা সপ্নেও কল্পনা করেনি শৈলী। তাই একদম বাকরুদ্ধ হয়ে গেল মুহুর্তেই।
শৈলীর নীরবতায় খাদিজা এক কদম এগিয়ে আবারো ঠান্ডা কন্ঠে শুধালেন,
" এই মেয়ে, কথা বল। সেই রাতে ছাদে কী করছিলি?"
শৈলীর বুকটা নিমিষেই আবারো ধক করে উঠল। মনে হলো পুরো শরীরের রক্ত যেন জমে গেছে। নিশানের সাথে সেই রাতের ঘটনাটা বড়মা দেখে ফেলেছেন? তাহলে এখন কী হবে? বুকের ভেতরটা এক অজানা আতঙ্কে কুঁকড়ে উঠল তার। শৈলী অসহায়ভাবে খাদিজা তালুকদারের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেখানে সন্দেহের ধারালো ছুরি খেলা করছে।
গলা শুকিয়ে এলো শৈলীর। নিজেকে সামলে ঠোঁটের কিনারায় জ্বিভ বুলিয়ে কোনোভাবে বলল,
"আমি...মানে আমরা তো.. আমরা শুধু....!"
খাদিজা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেন।
" শুধু কী? গল্প করছিলি? নাকি নিশানকে ফাঁদে ফেলার নতুন কৌশল করছিস?"
শৈলীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। খাদিজার এই কথা তার হৃদয়ে চাবুকের মতো আঘাত হানল। নিশান তার কাছে কতটা সম্মানের, শ্রদ্ধার, ভরসার জায়গা, সেটা কেউ বোঝে না। কিন্তু বড়মার চোখে সে যেন শুধুই এক চতুর মেয়ে, যে কোনোভাবে নিশানকে কাছে পেতে চাইছে!
শৈলী দ্রুত মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল,
" না, বড়মা! ভুল ভাবছো। আমি কিছু করিনি! নিশান ভাই তো ওই আমার পড়াশোনা নিয়ে...."
খাদিজা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
" ওমা তাই? পড়াশোনা! ছাদে রাতবিরেতে একা একা পড়াশোনা নিয়ে আলাপ হয়, তাই না? কেনো, দিনে কি তুই মরে যাস? আমি তোর চালাকি বুঝি না ভেবেছিস?"
শৈলী কেঁপে উঠল। সে জানত, বড়মাকে বোঝানো অসম্ভব। তবু সে আবার বলল,
"বড়মা, প্লিজ বিশ্বাস করো। আমি কিছু করিনি। নিশান ভাই আমাকে নিয়ে কখনোই....!"
খাদিজা এবার একটু রাগত স্বরে বললেন,
" থাম তুই, নামটা মুখেও আনবি না। তোর মতো একটা পরের মেয়ে আমার ছেলের নাম মুখে আনবে না! আমি কিছুতেই নিশানকে তোর গুটি বানাতে দেব না, বুঝলি?"
শৈলী এবার চোখ বন্ধ করল। বুকের গভীরে একটা শূন্যতা ছড়িয়ে গেল। তার নিজের বাড়ি নেই, নিজের বাবা অসহায় হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, আর এই বাড়িতে সে শুধু একজন বোঝা। নিশানই একমাত্র, যাকে সে একটু ভরসা করতে পারে। কিন্তু খাদিজার চোখে সে যেন কেবল একটা ভয়ঙ্কর ভুল। শৈলী এবার বুঝলো কেনো আজ খাদিজা তার রুমে এসেছে।
শৈলী চোখ খুলে শান্ত গলায় বলল,
" তুমি ভুল ভাবছো বড়মা। সেই রাতে তো শুধু কথাই বলছিলাম। নিশান ভাই মোটেও....! "
ক্ষেপে উঠলেন খাদিজা,
" এই চুপ কর। আমি জানি নিশানকে। আমার ছেলের যে এত খারাপ রুচি নেই, তা আমি জানি। তবে তোর মত ছোটলোকের উপর তো বিশ্বাস নেই। বলা তো যায় না, হয়তো চুপিচুপি প্ল্যান করেছিস এই বাড়িতে পার্মানেন্টলি ঘাঁটি গাড়ার আর এই বাড়িতে স্থায়ীভাবে ঘাঁটি গাড়তে তো একটা মাত্রই রাস্তা খোলা আছে। সেটা হচ্ছে এ বাড়িতে মেয়ে হয়ে না থেকে, বউ হয়ে থাকা। আর সেই হিসেবে নিশানই তো তোর জন্য একমাত্র গুটি, তাই না? আমার নিশানকে যে তুই নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবি না, এটার কী গ্যারান্টি আছে?"
শৈলী স্তব্ধ হয়ে গেল। খাদিজা তালুকদারের প্রতিটি শব্দ তীক্ষ্ণ বর্শার মতো তার হৃদয়ে বিঁধতে লাগল। নিশান কে সে পরিবারের সবচেয়ে আপনজন ভাবে, যার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা! সেই নিশানকে নিয়ে খাদিজা এমন কথা বলছেন! আর তার নিজের সম্পর্কে? সে নিশানকে মনের এক কোণে জায়গা দিলেও তো কখনো তাকে নিয়ে এমন নোংরা কিছু ভাবেনি! নিশানকে ব্যবহার করার মতো জঘন্য চিন্তা মাথাতেও আসেনি তার।
শৈলীর গলায় দলা পাকিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে শক্ত থাকল। চোখের পানি আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
"তুমি আমার সম্পর্কে যা ইচ্ছে ভাবতে পারো, বড়মা। কিন্তু আমি জানি আমি কারোর জন্য বোঝা হতে চাই না, কারোর জীবনে জোর করে জায়গা নিতে চাই না।"
খাদিজা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, যেন শৈলীর উত্তর তার প্রত্যাশার বাইরে গেছে। শৈলী এবার চোখ তুলে বড়মার দিকে তাকাল। চোখ দুটো লালচে হয়ে গেছে, কিন্তু স্বরে স্পষ্ট দৃঢ়তা।
"আমি পার্মানেন্টলি এ বাড়িতে থাকতে চাই না, বড়মা। বরং দিন গুনছি, কবে এখান থেকে বের হয়ে নিজের একটা জায়গা তৈরি করতে পারব। খুব চেষ্টা করছি। কেঁদে কেটে আল্লাহর কাছে দোয়া করছি যেন কোনো একটা ভার্সিটিতে আমার চান্স হয়ে যায়, যেন নিজে একটু উপার্জন করার মত ক্ষমতা অর্জন করতে পারি৷ এখন শুধু বাবার জন্য এখানে থাকছি, কারণ বাবাকে ফেলে কোথাও যেতে পারব না। ওনার চিকিৎসার খরচ দেয়ার মতো তো টাকা আমার নেই। আর নিশান ভাই? উনি তো আমার অভিভাবক,বড়মা। আমি যখন নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি, যখন এই পৃথিবীতে সমাজের কাছে অনাথ উপাধিটা পেয়েছি, তখন তো অভিভাবক হিসেবে তোমরাই আমার সব। তোমরাই তো আমার অভিভাবক। নিশান ভাই, মামনি, রিমি, মিমি, তুমি, বড় আব্বু। তোমরা ছাড়া তো আমার কেউ নেই বড়মা। নিশান ভাইকেও আমি তোমাদের মতই সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি। সে আমার অভিভাবক। তুমি ওনাকে আমার সঙ্গে টেনে এনে এভাবে অপমান করবে, সেটা ভাবিনি বড়মা।"
খাদিজার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। তবে তিনি এত সহজে হার মানার মানুষ নন। মুখ বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,
"তুই যদি সত্যিই এখানে থাকতে না চাইতি, তাহলে এতদিনে চলেই যেতি। তোকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। বিয়ের পর কি পড়াশোনা করা যেত না? বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে মাঝে মাঝে তোর বাবাকে দেখে যেতে পারতি না? পারতি তো। কিন্তু যাওয়া হয়নি, তাই না? নিশানের ছায়ায় আরাম পেয়ে গেছিস বলেই যাওয়ার কথা ভাবিস না!"
শৈলীর সমস্ত ধৈর্য চূর্ণ হয়ে গেল। এবার সত্যিই সে চোখের পানি আটকাতে পারল না। কিন্তু স্বরটা তখনো শান্ত, শুধু একটু কাঁপা কাঁপা,
"এই বাড়িতে আমি নিশান ভাইয়ের জন্য থাকছি না, আমি আমার বাবার জন্য থাকছি বড়মা। উনি যদি সুস্থ হয়ে ওঠেন, আমি এক মুহূর্তও এখানে থাকব না। আপনাকে কথা দিলাম। তুমি আমায় ভুল বোঝো না। বিশ্বাস করো, আমি কখনোই নিশান ভাইকে ব্যবহার করিনি। উনি ব্যবহার করে ছুঁড়ে দেওয়ার মত মূল্যহীন মানুষ নন বরং উনি হয়তো কারো বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়।"
শৈলীর গলাটা কেঁপে উঠল, কিন্তু সে শক্ত থাকল। চোখের জল আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়লেও কণ্ঠে একটা দৃঢ়তা ছিল। সে আজ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ করেনি, কখনো নিজেকে বোঝা বলে মনে হতে দেয়নি। কিন্তু আজ বড়মার কথাগুলো তার হৃদয়ে এত গভীর ক্ষত তৈরি করল যে আর চুপ থাকা সম্ভব হয়নি।
খাদিজা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। শৈলীর এই শান্ত অথচ দৃঢ় প্রতিবাদ যেন তাকে খানিকটা হতবাক করে দিল। তবে তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে তীব্র কণ্ঠে বললেন,
"এত ন্যাকা কান্না আমাকে দেখাতে হবে না। আমি তোকে ভালো করেই চিনি। তোর কথায় আমি একটুও বিশ্বাস করি না। নিশানও তোকে মাথায় তুলেছে, সে তো আমার কথাও শোনে না এখন!"
শৈলীর গলা এবার সত্যিই আটকে এল। নিশান কি সত্যিই বড়মার কথা শোনে না? সে কি বড়মার চোখে অন্যরকম হয়ে উঠেছে? সেটা কি তার জন্য? নিশান যদি কখনো জানতে পারত, বড়মা তাকে এইভাবে দোষারোপ করছেন, তাহলে সে কী করত?
শৈলী গভীর শ্বাস নিল, চোখের পানি মুছে ধীরে বলল,
"আমি যা বলার ছিল, বলে দিয়েছি বড়মা। তুমি যদি আমাকে ভুল বোঝো, তাহলে কিছু বলার নেই। শুধু এটুকুই বলব, নিশান ভাই আমার শ্রদ্ধার জায়গা, সেটা কখনো বদলাবে না।"
স্বরে কোনো অনুনয় ছিল না, কোনো অভিযোগও ছিল না। শুধু একরকম মৃদু ক্লান্তি ছিল। খাদিজা তালুকদার এক মুহূর্ত শৈলীর দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"যদি আর কখনো নিশানের কাছে অপ্রয়োজনীয় কারনে ঘেঁষতে দেখি, তোর পরিণতি ভালো হবে না!"
তারপর দরজার দিকে এক পা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
"নিশানের কাছ থেকে দূরে থাকবি, এটা তোর জন্য আমার শেষ সতর্কবার্তা। যদি আর একবার দেখি, তোদের মধ্যে কোনো অযাচিত কিছু হচ্ছে, তাহলে তোর এই বাড়িতে থাকার অধিকারও থাকবে না। মনে রাখিস!"
কিছুক্ষণ থেমে পেছনে না ঘুরেই আবারো বললেন,
" আজ থেকে নিশানকে ভাইয়া বলে ডাকবি! ওর নাম যেন মুখে না আসে। ভাইয়া বলবি, শুধু ভাইয়া!"
বলেই শক্ত পায়ে দরজা ঠেলে বাইরে চলে গেলেন খাদিজা।
শৈলী অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল, কেবল দরজার দিকে তাকিয়ে। বুকের ভেতরটা দমচাপা লাগছে। প্রচণ্ড ভারী একটা অনুভূতি জমাট বাঁধছে। একবার শৈলীর মনে হলো নিশানকে সব বলে দেবে। কিন্তু তারপরই ভাবল, কেন বলবে? নিশান তো তার পাশে থাকার শপথ নেয়নি। সে যদি সত্যিই কিছু বোঝে, তাহলে নিজে থেকেই একদিন বুঝবে।
শৈলী ধীরে ধীরে চেয়ারে গিয়ে বসল। বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড ভারী লাগছে। চোখের কোনায় অজান্তে জল জমে উঠেছে। কিন্তু সে সেটা মুছল না। কেবল নিচের ঠোঁট কামড়ে শক্ত করে নিজের হাতটা মুঠো করে ধরল। বইটা হাতে নিল, কিন্তু চোখের সামনে শব্দগুলো কেবল অস্পষ্ট হয়ে উঠল। গভীর শূন্যতায় ডুবে গেল সে।
এই বাড়ি, এই পরিবার, এই সম্পর্কগুলো কি কোনোদিন সত্যিই তার হবে? নাকি সে শুধু এক বোঝা হয়েই থাকবে চিরকাল? কিছুই বলার নেই তার। কিছুই করার নেই। শুধু নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকল, নিশান কি কখনো জানতে পারবে, তাকে নিয়ে শৈলী কতটা লড়াই করে যাচ্ছে? হয়তো একদিন নিশান জানতে পারবে। কিন্তু সেই দিন আসার আগেই, শৈলীর যুদ্ধটা শেষ হয়ে যাবে কিনা, সেটা সে নিজেও জানে না......
~~★
তালুকদার গ্রুপের বিশাল কর্পোরেট বিল্ডিং রাজধানীর প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। বহুতল এই ভবনের গ্লাসের জানালাগুলোতে সূর্যের আলো পড়ে চকচক করে। ভেতরে ঢুকতেই করিডোরজুড়ে কর্পোরেট পরিবেশের ছাপ স্পষ্ট। সবকিছু সুবিন্যস্ত, নিখুঁত ও আধুনিক। অফিসের প্রতিটি কর্মচারী ব্যস্ত, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউবা ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ গেঁথে রেখেছে।
এ বিল্ডিংয়ের সপ্তম তলায় তালুকদার গ্রুপের বর্তমান সাইড ডিরেক্টর ও উত্তরসূরি নিশান তালুকদারের ব্যক্তিগত কেবিন। কাচঘেরা প্রশস্ত রুম, মাঝখানে কালো মার্বেলের টেবিল, একপাশে নরম চামড়ার সোফা, আর টেবিলের ওপরে কিছু জরুরি ফাইলের স্তূপ। দেয়ালে কোম্পানির পুরনো কিছু ছবি বাঁধানো।
নিশান কালো ফর্মাল প্যান্টের সাথে ক্রিস্প হালকা নীল শার্ট পরে আছে, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। সরল অথচ রাজকীয় ধরন, যেন তার সৌন্দর্যকে আরও তীক্ষ্ণ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। খানিক উজ্জ্বল গায়ের রঙ, গভীর কালো চোখ, যেখানে অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণতা লুকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়লে মনে হয়, ভেতরে একটা দুর্নিবার শক্তি আছে, যা মানুষকে মুহূর্তেই তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। আর নিশানের ফোলা মাংসপেশি, চওড়া কাঁধ আর সুঠাম শরীর তাকে আরও ব্যক্তিত্ববান করে তুলেছে। চুলগুলো সবসময়ই যত্নে থাকে। এমন গেট আপে সুঠাম শরীরের অধিকারী নিশানকে দেখে যে কেও পিছলে যাবে নিশ্চিত।
এই মুহূর্তে নিশান টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো দেখছে, আর চোখেমুখে চূড়ান্ত মনোযোগ। তার হাতে একটা ব্লাক পেন, যেটা বেশ কায়দা করে নির্বিঘ্নে ঘোরাচ্ছে, যেটা নিশান চিন্তারত অবস্থায় প্রায়ই করে। তার সামনের টেবিলে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকারী মারুফ বসে আছে, গম্ভীর মুখে কিছু নোট লিখছে। মারুফ বেশ দক্ষ একজন এক্সিকিউটিভ, নিশানের ডান হাত বলা চলে।
নিশান ফাইলের কিছু পৃষ্ঠা উল্টে রেখে সোজা হয়ে বসল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
" গুলশানের ফ্যাক্টরির ফাইল এনেছো?"
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে ফাইলটা এগিয়ে দিল, বিনয়ী কণ্ঠে বললো,
"জি, স্যার। এটা গত পাঁচ বছরের রিপোর্ট। যদিও দেখেছেন, আর একবার দেখে নিন। আরো কিছু ডিটেলস এড করেছি। ফ্যাক্টরিটটা সম্পূর্ণ অচল পড়ে আছে স্যার। জায়গাটা তো অনেক দামি হয়ে গেছে, বিক্রি করলেও লাভ হবে।
নিশান ঠোঁট কামড়ে নিলো, মাথা দুদিকে নেড়ে বলল,
" তা তো আমিও জানি। আমিও প্রথমে এটাই ভেবেছিলাম। তবে বাবার কথা শুনে একটু চিন্তা-ভাবনা করলাম বাবার কথায় যুক্তি আছে। বিক্রি করাটা খুব সহজ সিদ্ধান্ত, কিন্তু আমি এখনো নিশ্চিত নই। জায়গাটা স্ট্র্যাটেজিক, লোকেশন ভালো। যদি এটাকে রি-ডেভেলপ করা যায়, তাহলে আরও ভালো রিটার্ন পাওয়া যাবে।"
মারুফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
"কিন্তু স্যার, আমাদের এখানে নতুন প্রজেক্ট নিলে ইনভেস্টমেন্ট অনেক লাগবে। আর পুরোনো ফ্যাক্টরি রি-ডেভেলপ করতে গেলে কিছু লিগ্যাল ইস্যু আছে, কিছু ট্যাক্স ডিউ বাকি রয়েছে।"
নিশান পেনটা হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে কিছু ভাবল, তারপর চোখ তুলে মারুফের দিকে তাকিয়ে বলল,
"সেসব আমি ম্যানেজ করব। ডোন্ট ওরি! তুমিও একটা হিসেব করো, যদি আমরা এটাকে আধুনিক বানিয়ে ভাড়া দেই বা অন্য কাজে লাগাই, তাহলে ইনভেস্টমেন্ট ফেরত পেতে কতদিন লাগবে। একটা বিশদ রিপোর্ট তৈরি করো, আমি নিজে যাচাই করব।"
মারুফ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল,
"ঠিক আছে, স্যার। আমি আজকের মধ্যেই রিপোর্ট তৈরি করে দেব। তবে স্যার, যদি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে কিছু প্রপার্টি ডেভেলপার কোম্পানি আগ্রহী আছে, তারা বেশ ভালো প্রাইস অফার করতে পারে।"
নিশান এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের শহরটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"বিক্রি করা সবচেয়ে সহজ রাস্তা মারুফ, কিন্তু আমি সহজ পথ নিতে চাই না। আমি চিন্তা করব, তারপর সিদ্ধান্ত নেব।"
মারুফ নিশানের ব্যক্তিত্ব ভালো করেই জানে। সে কখনো আবেগ বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু করে না। তাই মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
"ঠিক আছে, স্যার। আমি রিপোর্ট নিয়ে আসছি।"
নিশান মাথা নাড়ল। কিন্তু তার চোখে এখনো চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। গুলশানের ফ্যাক্টরিটা তার বাবা ও চাচার আমলে স্থাপিত হয়েছিল। এত সহজে সেটা বিক্রি করে দেওয়া যাবে কি? নাকি নতুনভাবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জটা নেওয়া উচিত? বাবা নাসিরুল তালুকদারের বিরুদ্ধে সে কখনোই সিদ্ধান্ত নেবে না। বরং বাবার নেওয়া সিদ্ধান্তই সঠিক সিদ্ধান্ত এটাই সে জেনে এসেছে ছোটকাল থেকে।
~~~★
নিশান কফির মগটা তুলে এক চুমুক দিল। চোখের কোণে খানিক ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু মুখের রেখাগুলো আজও সেই আগের মতো দৃঢ়। ফাইলের একপাশে রাখা কলমটা আঙুলের ডগায় ঘোরাতে ঘোরাতে জানালার বাইরে তাকাল সে। গুলশানের উঁচু বিল্ডিংগুলোর পেছনে বিকেলের রোদ খানিকটা ফিকে হয়ে আসছে।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় টোকা পড়ল। নিশান দৃষ্টি না সরিয়েই গম্ভীর স্বরে বলল,
" কাম ইন! "
দরজা খুলে ঢুকল আকাশ। সাদা শার্টের হাতা গুটিয়ে, কালো ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে রাখা এক নির্লিপ্ত ভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে এল সে। চেহারায় সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী ভাব, তবে নিশানের চোখে চোখ পড়তেই হাসল একপাশে।
বাঁকা হেসে চুল ব্যাকব্রাশ করে একটু ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে আকাশ বলল,
" কিরে বস, কেমন আছিস? খবর কী?"
নিশান টেবিলের ওপর কলমটা ফেলে ঠান্ডা চোখে তাকাল,
"যতটা পারি ব্যস্ততার মধ্যে ভালো আছি। তুই?"
আকাশ হাসল, চেয়ারে বসে বলল,
" ঝাক্কাস ভাই, ঝাক্কাস। তোর মতো পেটের মধ্যে ভাত রেখে চুপচাপ বসে থাকার মানুষ নাকি আমি? হজম করতে শেখো বন্ধু. নইলে দেখবে পেটের ভাত গলা দিয়ে আবারো বেরিয়ে আসছে। "
নিশান তৎক্ষণাৎ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মুখে হাজারো বিরক্তির রেখা স্পষ্ট। এরকম উদ্ভট কথার মানে বুঝতে একটু সময় লাগলো তার। নিশানের এমন কঠিন অভিব্যক্তি দেখে আকাশ ম্লান চোখে তাকিয়ে বলল,
" দোস্ত, এখন তোকে দেখে মনে হচ্ছে, আমি তোর অফিসের বস আর তুই আমার এমপ্লয়ী! এভাবে কঠিন মুখ করে বসে থাকিস কেন? আরে ভাই, মানুষ হাসেও তো মাঝে মাঝে!"
নিশান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কফির কাপটা নামিয়ে রাখল।
" হাসির সময় পেলেই হাসি। যা বলার আছে, বল। ফালতু কথা বললে লাথি মে'রে কেবিন থেকে বের করে দিব! তবুও কানের কাছে প্যানপ্যান করলে বাবাকে বলে তার এই চাকরি নদীতে ভাসিয়ে দেবো!"
আকাশ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকল নিশানের দিকে, তারপর ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বলল,
" বাহ বাহ! দোস্ত, এতদিনে ঠিক ঠাক তালুকদার পরিবারে মানিয়ে গেছিস দেখছি! একেবারে বাপ কা বেটা! কিন্তু সমস্যা জানিস কোথায়?"
নিশান ধৈর্যহীন কণ্ঠে বলল,
"কোথায়?"
আকাশ ঢোঁক গিলে বলল,
"তোকে কেউ ভয় পায় না, ভাই! লাথি মেরে বের করে দিবি বললেই যে আমি বের হয়ে যাব, এমনটা ভাবলি কীভাবে? আর বাবাকে বলে চাকরি খেয়ে দেবি? হাহ! তোর বাবার চেয়েও আমি বেশি প্রয়োজনীয় এখানে!"
নিশান একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল, ঠোঁটের কোণে সামান্য তাচ্ছিল্যের হাসি।
"তুই নিজেকে অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবছিস কেন?"
আকাশ গম্ভীর মুখে বলল,
"কারণ আমি আকাশ, আর তুই নিশান! আমি আকাশ থেকে নিশান খুঁজে পাই, আর তুই নিশান থেকে আকাশ হারিয়ে ফেলিস।"
নিশান কপালে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আকাশ, কথা কম, কাজের কথা বল!"
আকাশ এবার সত্যিই হাসল।
"ঠিক আছে ঠিক আছে, এবার সিরিয়াস হই। গুলশানের ফ্যাক্টরির ব্যাপারে কি ভাবছিস?"
নিশান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, তারপর টেবিলের ওপর থাকা একটা ফাইল ঠেলে দিল আকাশের দিকে।
"বসে আছি ফাইল নিয়ে, ভাবছি কীভাবে জায়গাটা কাজে লাগানো যায়। তুই বল, তোর কী মত?"
আকাশ ফাইলের একটা পাতা উল্টে বলল,
"আমার মত? আমি তো বলব জায়গাটা জুয়াড়িদের হাতে চলে যাওয়ার আগেই কাজে লাগিয়ে ফেল। না হলে পরে পস্তাতে হবে, দোস্ত!"
নিশান কিছু একটা ভেবে বলল,
"জায়গাটা ভালো, কিন্তু ফ্যাক্টরিটা বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে। এখন কী পরিকল্পনা?"
আকাশ ফাইলের পাতা ওল্টাল।
"এটা তোকে বলার জন্যই এসেছি। জায়গাটা যদি ঠিকঠাক কাজে লাগানো যায়, তাহলে নতুন একটা ইউনিট দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু তোকে জানতেই হবে, ওটা ফাঁকা পড়ে থাকার পেছনে আসল কারণ কী!"
নিশান একটু পিছনে হেলে চেয়ারে হাত রাখল।
"মানে?"
আকাশ এবার গম্ভীর হল।
" মানে, জায়গাটা নিয়ে সামান্য ঝামেলা আছে। কয়েকজন প্রভাবশালী লোকের চোখ আছে ওই জমির ওপর। তুই যদি কাজে লাগাতে চাস, তাহলে তোকে সরাসরি মাঠে নামতে হবে, আর ঝামেলা বাঁধতে পারে!"
নিশান ঠোঁট চেপে ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
" ঝামেলা থাকুক। এই অফিসটা চালানোর দায়িত্ব আমার ওপর, আর আমি চাই না আমাদের কোনো সম্পত্তি অব্যবহৃত পড়ে থাকুক। কাজ শুরু কর, দেখছি কী করা যায়।"
আকাশ একপাশে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর মাথা নেড়ে বলল,
"ঠিক আছে, দেখি কী করা যায়। তবে সাবধানে থাকিস, কিছু লোকের নজর এখন থেকেই তোর দিকে!"
নিশান আকাশের এমন কথা শুনে অনেক গুরুতর ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
" কী বলতে চাইছিস তুই?"
বেচারা নিশান! সে ভেবেছিল আকাশ সত্যিই কোনো কাজের কথা বলবে। হয়তো কোন প্রতিপক্ষ শত্রু তাদের দিকে নজর রাখছে। অথচ নিশানকে আহাম্মক বানিয়ে আকাশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চোখমুখে বিষাদ এনে বলে উঠলো,
" আরে...অনেক লোকের নজর তোর দিকে। আর প্রথম নজর টা তো তোর বাড়ি থেকেই শুরু। আবার অফিসে হিয়াও নজর দিচ্ছে। কি একটা বাজে অবস্থা! তোকে দেখে মাঝে মাঝে মায়া হয় জানিস দোস্ত! বাড়িতেই কারো নজর সামলাতে পারিস না। আবার অফিসে এসে আর একজন নজর দেয়। বলা তো যায় না! কখন কার নজর লেগে যায়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তোর কপালে একটা বড় চাঁদের মতো টিপ দিয়ে দিই। "
নিশান এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে গেল। আকাশের মুখের দিকে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
" জুতা চিনিস?"
" হ্যাঁ চিনি তো। চিনব না কেনো? শোন তবে..!"
আকাশ একটুও না থেমে নাটকীয় ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলতে লাগল,
"জুতা হলো এমন একখান ভয়ানক বস্তু, যেইটা আমাদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটার অস্তিত্ব ছাড়া সভ্যতা টিকতে পারত না! মানুষ পথে হাঁটতে পারত না, সভায় যেতে পারত না, কাউকে খেদিয়ে মারতেও পারত না! আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কী জানিস? জুতা হলো মানবজাতির অন্যতম শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা!"
নিশানের কফির কাপে ঠোঁট রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আকাশ আবার বলল,
" একটু ভেবে দেখ বন্ধু, যদি হুট করে রাস্তায় কেউ তোর দিকে এগিয়ে আসে, তোর কিছু না থাকলেও পায়ের নিচে একটা অস্ত্র থাকবেই- জুতা! অনায়াসে হাতে তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে মারতে পারবি! আবার দেখ, কতো ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই জুতা! রাষ্ট্রনায়কদের দিকে জুতা ছোড়ার ঘটনা থেকে শুরু করে প্রেমে ব্যর্থ পাত্রদের পিঠে জুতার দাগ বসানো, সব কিছুতেই এর ভূমিকা অনস্বীকার্য!"
গলায় কফি আটকে গেল নিশানের। কোনোমতে নিজেকে সামলে আবারো ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকালো আকাশের দিকে। আকাশ বলল,
" আরেকটা বিষয় জানিস? জুতার শক্তি এমন পর্যায়ের যে, এটি হারিয়ে গেলে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়! জুতার সন্ধানে ঘন্টার পর ঘন্টা মানুষ পাগলের মতো ঘোরে, আত্মীয়-স্বজন জিজ্ঞেস করে, ‘জুতা কই?’ আর যদি নতুন জুতা পরিস, তখন? আহা! নতুন জুতা পায়ে দিলেই কেমন যেন রাজকীয় ফিল আসে! অথচ সেই জুতাই আবার নতুন অবস্থায় এমন কামড় বসায়, মনে হয় শত্রুর কানে কানে লুকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলছে, 'আমি তোর পা শেষ করব!’"
নিশান কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছে নেই তার। হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে নিশান আস্তে করে কফির কাপটা নামিয়ে রেখে দাঁত খিঁচিয়ে বলল,
" তোর কি মাদারবোর্ডের সমস্যা হয়েছে? মাথার কোন তারটা ছিঁড়েছে, একটু দেখাতো আমায়!"
আকাশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিশানের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর গম্ভীর মুখে বলল,
"মাদারবোর্ড? ভাই, আমি তো হাই কোয়ালিটি ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট! আমার মাদারবোর্ড তো একেবারে ইন্টেল কোর আই-নির্ভর! তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে প্রসেসরের ওপর চাপ পড়ে গেলে হালকা হ্যাং করে... কিন্তু সেটা তো প্রাকৃতিক ব্যাপার, বুঝলি?"
নিশান চোখ বন্ধ করে ধৈর্য ধরে কিছুক্ষণ শ্বাস নিল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
" তোর হ্যাং হওয়া বন্ধ করতে গেলে একটা কাজ করতে হবে।"
আকাশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে বলল,
"কী কাজ?"
নিশান মুখ গম্ভীর করে বলল,
"একটা ঠাণ্ডা নোংরা পানির বড় বালতি এনে মাথার ওপর ঢেলে নিবি। প্রোডাক্ট হাই কোয়ালিটির হলে সমস্যা ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা!"
আকাশ হো হো করে হেসে উঠে বলল,
" ওয়াও ভাই। জোস আইডিয়া। এই তো চাই! অবশেষে তোর মুখে একটা কাজের কথা শুনলাম। এইবার বুঝলাম, তুইও আস্তে আস্তে মানুষের কাতারে আসছিস!"
নিশান কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করল। এ ছেলে একদিন নিশ্চিতভাবে তাকে পাগল করে দেবে!
" তুই কি সত্যিই এই অফিসে কাজ করতে আসিস নাকি শুধু ফালতু কথা বলতে?"
আকাশ একগাল হাসল,
"দোস্ত, কাজ তো করি, তবে বিনোদনও দরকার! জীবনটা শুধু সিরিয়াস হলে চলে?"
নিশান কফির কাপ হাতে নিয়ে ঠোঁটের কাছে তুলল, তারপর আবার নামিয়ে রাখল। আকাশকে এভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না, সেটা সে জানে। তাই গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"ঠিক করে বল, তুই হিয়ার কথা কেনো বললি? হিয়া কী করেছে?"
আকাশ শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
"হিয়া! ও তো তেমন কিছু করেনি, তবে ওর চোখ দুটো যা করছে, তা সত্যিই দেখার মতো! মেয়েটা তোরে চোখ দিয়ে গিলে খায় দোস্ত। এমন ভাবে তাকায় যেন জন্মেও বেডা দেখে নাই। অবশ্য তাকায় থাকারই কথা। তোরই দোষ! শা'লা পাজামা পাঞ্জাবি পরে মুরুব্বির মত অফিসে না এসে তুই নায়কের মত অফিসে এসে বসে আছিস! পুরো অফিস জানে মেয়েটা তোকে পছন্দ করে। শুধু তুই জানিস না বা জানতে চাস না।"

নিশান একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
" ওসব ভাবার সময় নেই আমার।"
আকাশ ভ্রু নাচিয়ে বলল,
" তোর বাড়িরটাকে নিয়েও ভাবার সময় নেই, বাইরের এটাকে নিয়েও ভাবার সময় নেই? তাহলে ভাববি কাকে নিয়ে ভাই? আদৌও কখনো সময় থাকবে?"
"ভবিষ্যতে থাকবে।"
ছোট করে ইঙ্গিত টা দিয়েই নিশান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আকাশ তার কথায় একটু থমকে গেল, নিশানের চোখের মধ্যে যে স্থিরতা ছিল, তা তার মনের গভীরে শীতল শূন্যতা তৈরি করেছে। নিশান আবার কফির কাপ হাতে তুলে নিল, এক ঝলক আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
"সব কিছু সময় মতোই হবে। যতক্ষণ আমি চাই না, কোনো কিছুই ঘটবে না।"
আকাশ হাসল, তবে তার হাসি এবার একটু চাপা। সে জানত, নিশান কখনোই সহজে তার মন খুলে কিছু বলবে না। তবে সে একবার চেষ্টা করে দেখতে চাইল,
"তবে তুই কি জানিস, নিশান, কোনো কিছু না ভাবলে, বা সময় না দিলেই সব কিছু ঠিক হয়ে যায় না। জীবন নিজেই কখনো কখনো পরিকল্পনা সাজিয়ে দেয়।"
নিশান এক মিনিট চুপচাপ রইল, তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
"জীবন যদি পরিকল্পনা সাজাতে পারে, তবে আমি তার পরিকল্পনায় কি করতে পারি?"
আকাশ মুচকি হাসে,
" তোর প্রশ্নে যে উত্তরের মধ্যে সত্যি একটা গভীরতা রয়েছে, সেটা তো আমি জানি। তোর নিজের পথ খুঁজে নেয়ার সময় তো আসবেই।"
নিশান কোনো উত্তর দিল না, কিন্তু তার মধ্যে অদ্ভুত একটা স্থিরতা ছিল, যেন একদিন সব কিছু বুঝে নেবার জন্য সে প্রস্তুত।
"আকাশ, ফালতু কথা কমিয়ে এখন কাজের কথায় আয়। গুলশানের ফ্যাক্টরি নিয়ে কী করব, সেটা নিয়ে ভাব।"
আকাশ মুচকি হাসল।
"ঠিক আছে বস, চল কাজ শুরু করি!"
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url