প্রেমের লাল ছোয়া পর্ব ২
প্রেমের লাল ছোয়া
তালুকদার বংশের একসময় প্ রচুর সুনাম ছিল শুধু বিত্ত-বৈভবের জন্য নয়, বরং পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর ভালোবাসার জন্যও। একে অপরের প্রতি থাকা অসামান্য ভালোবাসার জন্য। এই পরিবারের প্রতিটি সদস্য একসূত্রে গাঁথা ছিল, যেন একে অপরের ছায়া। সম্পর্কগুলো ছিল রক্তের বাঁধনের চেয়েও দৃঢ়, যেখানে ছোট-বড় সবার প্রতি ছিল সম্মান, স্নেহ আর নির্ভরতার এক অদৃশ্য বন্ধন। এই বাড়ির সকালগুলো শুরু হতো একসঙ্গে নাশতা করার মাধ্যমে। পরিবারের বড় দুভাই শরিফুল তালুকদার এবং নাসিরুল তালুকদার, তাদের বাবা মারা যাওয়ার পরেও আলাদা না হয়ে এই বাড়িতে সুখে বউ বাচ্চা নিয়ে বসবাস করতেন। গল্প করতেন পুরনো দিনের, আর ছোটরা চুপচাপ সেই গল্প শুনে নিজেদের স্বপ্ন বুনত। বিকেলবেলা ছিল সবার একসঙ্গে বসার সময়, যেখানে সবার স্নেহমাখা কথা, চাচা-ফুফুদের হাসিঠাট্টা, আর ভাই-বোনদের মিষ্টি খুনসুটি মিলেমিশে এক উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করত। উৎসব-পার্বণ তো ছিলই, কিন্তু তালুকদার পরিবারের আসল ঐতিহ্য ছিল একে অপরের পাশে থাকা। কেউ অসুস্থ হলে অন্যরা ছায়ার মতো পাশে দাঁড়াত, কেউ দুঃখ পেলে সবাই মিলেই তা ভাগ করে নিত। এমনকি বাইরের লোকেরাও বলত, "তালুকদারদের সংসারে যে একবার ঢুকেছে, সে কখনো একা বোধ করেনি।" তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কগুলো আর আগের মতো থাকেনি। স্বার্থ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝি, ধীরে ধীরে তালুকদার পরিবারের সেই উষ্ণ বন্ধনকে ফাটল ধরিয়েছে। যে বাড়িতে একসময় ভালোবাসা আর একতা ছিল একমাত্র পরিচয়, আজ সেখানে জমেছে অবিশ্বাস আর দূরত্বের স্তর। নাসিরুল তালুকদারের একমাত্র ছেলে নিশান তালুকদার, যে কিনা বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবার বড়। নাসিরুলের স্ত্রী খাদিজা তালুকদার, যিনি খুবি দাম্ভিক একজন মহিলা। গরিব পরিবারে জন্ম নেওয়ার পর এই ধনী পরিবারে এসে অহংকার যেন বেড়ে গিয়েছে খানিকটা। যার দরুন নাসিরুলকেউ কিছুটা ভুগতে হয়। কিন্তু স্ত্রীকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসার কারণে কখনো উঁচু গলায় কথা বলার সাহস পাননি তিনি। দুই ভাইয়ের মধ্যে শরিফুল তালুকদার ছোট। তবে হৃদয়ের দিক থেকে ছিলেন সবার থেকে বড়। দুই ভাইয়ের মধ্যে মেলবন্ধন দেখার মতোই ছিল। শৈলী শরিফুলের একমাত্র মেয়ে। মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবাই শৈলীর একমাত্র অবলম্বন। এ বাড়িতে তারা ছাড়াও বসবাস করে শরিফুল এবং নাসরুলের ছোট বোন রাশিদা তালুকদার, যিনি বছরখানেক আগেই স্বামী হারিয়েছেন এবং নিজের জমজ দুই মেয়ে রিমি এবং মিমিকে নিয়ে এখানেই বসবাস করছেন। দুই ভাইয়ের আদরের বোন হওয়ায় কখনো কোনো অবহেলার শিকার হতে হয়নি তাকে। এ বাড়ির সবচেয়ে বড় সদস্য ছিলেন কুলসুম তালুকদার, যিনি নিশানের দাদি অর্থাৎ শরিফুল এবং নাসিরুলের মা। সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে একটা অ্যাক্সিডেন্টে শৈলীর বাবা শরিফুল তালুকদারের প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার পর। খাদিজা তালুকদার লোভে চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করেন আর এই কারণেই এখন তিনি পুরো বাড়ি দখলের জঘন্য চিন্তায় আছেন। শৈলীকে বাড়ি থেকে কোনোমতে বিদায় করে একাই রাজত্ব করতে চান যেন এই মহিলা। ~~★ শৈলী মাথা নিচু করে দু’হাতে মুখ ঢেকে নিজের ঘরের মেঝেতে বসে আছে। কাঁধ কাঁপছে অস্ফুট কান্নার দমকে, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো নীরবে মেঝেতে পড়ছে। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু সে শব্দ করতে পারছে না, যেন কান্নারও একটা বাধা আছে এই বাড়িতে। ঘরটা বেশ পরিপাটি, ছিমছাম। জানালার পর্দা হালকা ক্রিম রঙের, নরম হাওয়ায় আলতো দুলছে। কাঠের ছোট্ট টেবিলের ওপর রাখা কয়েকটা বই, কিছু গল্পের, কিছু তার পড়াশোনার। বিছানার ওপরে একটা নীল-সাদা চাদর, যার ওপর এখনও অবহেলায় ফেলে রাখা আছে সেই পাতলা শাড়িটা, যা খাদিজা তালুকদার তাকে জোর করে পরতে বলেছিলেন। দেয়ালের একপাশে একটা বইয়ের তাক, যেখানে সারি সারি গুছিয়ে রাখা বইগুলো শৈলীর প্রিয় বন্ধু। কিন্তু আজ ওদের দিকে তাকানোর ইচ্ছেও নেই তার। তাকের ঠিক ওপরের অংশে একটা ছবি বাঁধানো, বাবা-মার সঙ্গে ছোট্ট শৈলীর হাসিমুখের ছবি। সেই মুখটাই আজ শুকনো, নিস্তেজ। শৈলী সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত কিছুক্ষণ আগে ড্রয়িং রুমে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা নিয়ে৷ নিশান সবার সামনে জোর গলায় জানান দিয়েছে যে সে কালই শৈলীকে এ বাড়ি থেকে নিয়ে শহরের বাইরে থাকা বাংলোটাতে রেখে আসবে। এটা শুনে সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে শৈলী। সে কোনভাবেই ওই জঙ্গলে একা থাকতে চায় না। তালুকদার পরিবারের বেশ কয়েকটা বাংলো আছে। কিন্তু শহরের বাইরে থাকা ওই বাংলোটা সবচেয়ে বেশি ভয়ানক আর নিশান নামক অদ্ভুত পুরুষ সেই বাংলোতেই মাঝে মাঝে থাকে। নিশানের এমন নিষ্ঠুরতম সিদ্ধান্তে বেশ চিন্তিত শৈলী। কারণ সে নিজের বাবাকে এখানে রেখে কোথাও যেতে চায় না। লাথি উস্টা খেয়ে হলেও তাকে এখানেই থাকতে হবে যে। বাইরে কারও পায়ের আওয়াজ শোনা গেল, কিন্তু শৈলী তাকাল না। নিজের চিন্তায় মগ্ন রইলো, চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে কান্নায়, আর বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণাগুলো আরও গভীর হয়ে বসছে। অন্ধকার ঘরের কোণে বসে থাকা শৈলী নিজেকেই অচেনা লাগছে, এই বাড়ির দেয়ালে তার ইতিহাস লেখা থাকলেও, এখানে যেন তার কোনো জায়গা নেই। হঠাৎ করেই দরজাটা জোরে ঠেলে খুলে গেল। শৈলী চমকে মাথা তুলে তাকাতেই দেখল, রাশিদা তালুকদার তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকছেন। চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, শাড়ির আঁচল একপাশে কাঁধ থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছে, হাঁপাচ্ছেন যেন অনেকটা পথ দৌড়ে এসেছেন। শপিংমলে যাওয়ার পর নিশানের কাছ থেকে শৈলীর অবস্থার কথা শুনেই তো তিনি এতটা ব্যাকুল হয়ে ছুটে এসেছেন বাড়িতে। আজ তার অনুপস্থিতিতে যে এমন কিছু হবে সেটা তিনি অবশ্য আগেই আন্দাজ করেছিলেন তিনি। তবে তার ভাবি খাদিজা তালুকদার যে আবারও পাত্রপক্ষ নিয়ে আসবে বাড়িতে, এটা তিনি ভাবেননি। " শৈলী!"গলার স্বর উদ্বেগে কাঁপছে রাশিদার। শৈলী ভীষণ অবাক হয়ে গেল, কিন্তু কিছু বলল না। রাশিদা তালুকদার কোনো অপেক্ষা না করেই একেবারে শৈলীর পাশে বসে গেলেন। নরম হাতে শৈলীর মুখটা দু’পাশ থেকে ধরে চোখের দিকে তাকালেন। কান্নার দাগ, ক্লান্তি, যন্ত্রণা, সবকিছুই ধরা পড়ল তাঁর স্নেহমাখা দৃষ্টিতে। তার দুই মেয়ের মতো তো এই মেয়েকেও তিনি বুকে করে নিয়ে রাত জেগেছেন। " কান্না করছিস কেনো, মা? কষ্ট পাচ্ছিস?" রাশিদার গলা বড্ড নরম, যেন মা তাঁর ছোট্ট সন্তানকে বুকে টেনে নিচ্ছেন। শৈলী এতক্ষণ শক্ত করে চোখের পানি আটকে রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রাশিদার মায়ামাখা ছোঁয়া আর কথা শুনে আর পারল না। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল। সাথে সাথে মায়ের স্থানে জায়গা দেয়া মানুষটার বুকে আঁছড়ে পড়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কাঁদতে লাগল। রাশিদা কিছু না বলে শৈলীকে আরো শক্ত করে বুকে টেনে নিলেন। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, " কিছু হয়নি মা, আমি আছি তো। এইতো চলে এসেছি আমি। আর কাঁদিস না মা। তোর চোখের পানি আমি সহ্য করতে পারি না রে। আর কাঁদিস না, অভিশাপ লাগবে আমাদের উপর। মস্ত বড় অভিশাপ লাগবে।" শৈলী নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে উঠল। তার কাঁধ কাঁপছে, বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না থামাতে পারছে না সে। রাশিদা তালুকদার যেন ওর কান্নার প্রতিটা শব্দে ভেঙে পড়ছেন। শৈলীকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি এবার ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন, " বিশ্বাস কর মা, আমার যদি একটা যাওয়ার জায়গা থাকতো, আজ যদি আমার শ্বশুর বাড়িতে থাকতো, তাহলে আমি তোকে এখানে একদম রাখতাম না। তোকে নিয়ে আমি চলে যেতাম। কিন্তু আমি যে নিরুপায় মা। এই বাড়ি ছাড়া যে আমারো থাকার জায়গা নেই। আমি যে বিধবা। আমার শ্বশুর বাড়ি যে আমায় ত্যাগ করেছে মা। এই অসহায় মহিলা হয়ে, তোকে আমি কোথায় রাখব বল?" শৈলী এবার ঠোঁট কাঁমড়ে বলল, " এভাবে বলো না মামনি। আমি কোথাও যেতে চাইনা। এই বাড়িতেই থাকতে চাই। আমি যদি মরে যাই, তবে এই বাড়িতে থেকেই মরবো। আমি আমার বাবাকে রেখে কোথাও যাবো না, আমার মায়ের স্মৃতি রেখে কোথাও যাবো না। আমায় তোমরা বের করে দিও না মামনি... আমার একটা পরিচয়ের যে খুব দরকার।" রাশিদা তালুকদার শৈলীর মুখ দু'হাতের মাঝে নিলেন, স্নেহমাখা অথচ বেদনাদীর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। তাঁর চোখও চিকচিক করছে, কিন্তু নিজেকে শক্ত রাখতে হলো। গভীর মমতায় বললেন, " ওরে পাগলি! তোকে কেউ বের করে দেবে কেন? এই বাড়িতেই তোর শেকড়, এই বাড়িতেই তোর সব কিছু। তোর বাবা, তোর মা, তোর স্মৃতি.... তুই এখানেই থাকবি, মা। আমি থাকতে তোকে কেউ একচুলও নড়াতে পারবে না।" শৈলী অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল, কান্না গলাতে দলা পাকিয়ে আসছে। ফিসফিস করে বলল, " নিশান ভাই নাকি কাল আমায় বাংলোতে দিয়ে আসবে। আমি কিন্তু যাব না মামনি...তুমি নিশান ভাই কে বলে দিও যেন আমায় না বকে।" রাশিদা তালুকদার গভীর শ্বাস ফেললেন, বুঝতে পারছেন শৈলীর আশঙ্কা অমূলক নয়। নিশান মায়ের বিরুদ্ধেও যেতে পারবে না, পারবে না কঠিন কিছু করতে। আবার শৈলীর বেগতিক অবস্থাও বসে বসে দেখবে না। শৈলীর কপালে চুমু খেয়ে শক্ত স্বরে বললেন, " তোকে কোথাও যেতে হবে না। নিশানকে আমি বলব। ওই হতচ্ছাড়া নিজের মায়ের অন্যায় দেখেও চুপ থাকে আর তোকে বাড়ি থেকে বের করবে? ওকে আমি মজা বোঝাবো। তুই চুপটি করে থাক।" শৈলী বাধ্যের ন্যায় মাথা নাড়ালো। সে যে নিরুপায়। নিজের মতো করে চলার মতো, নিজের মতামত দেয়ার মতো কোনো অধিকার বা সুযোগ যে তার নেই। শৈলীর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে রাশিদা ফিসফিস করে বললেন, " এই বাড়ির দেয়ালগুলো জানে, তুই কত কষ্ট পাস। আমি জানি, মা। একটু কষ্ট করে সহ্য কর মা। তোর এইচএসসির রেজাল্ট বেরোক। আমি তোকে ভার্সিটিতে ভর্তি করাবো। ভালো করে পড়াশোনা কর যেন চান্স পাস। তাহলে তুই এই বাড়িতে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারবি মা। কারো উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হবে না তোকে, শুধু কিছুদিন একটু সহ্য কর। কষ্ট করে একটু পড়াশোনাটা কর আর আমি তো মরে যাইনি। আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন কিচ্ছু হতে দেবো না।" শৈলী শক্ত করে চোখ বন্ধ করল। আজ কতদিন পর এমন নিঃশর্ত স্নেহ পেল সে! কতদিন পর কেউ ওর কষ্টের কথা এভাবে বুঝল! রাশিদা আবার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "আমি তোর জন্য এসেছি, মা। তুই তো একা নোস। তোর জন্য ভাবির সাথে মুখোমুখি লড়াই করতে না পারলেও নীরবে যুদ্ধ চালাতেই পারি।" শৈলী চোখের পানি মুছতে চাইল, কিন্তু পারল না। কান্না যেন আজ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। রাশিদা তালুকদার তাকে শক্ত করে ধরে রাখলেন, যেন শৈলীর সব কষ্ট নিজের বুকে নিয়ে নেবেন। ~~~★ শৈলীর মুখ হাত ধুয়ে দিয়ে রাশিদা তালুকদার নিজের ঘরে পা বাড়ালেন। তার প্রস্থানের সাথে সাথেই নিশান আশাপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে শৈলীর ঘরে প্রবেশ করলো। মেয়েটা কেবলই আয়নার দিকে তাকিয়ে বড় করে শ্বাস ছেড়ে নিজেকে স্বাভাবিক করল। কিন্তু টাওয়াল হাতে নিয়ে গলায় থাকা বিন্দু বিন্দু পানিগুলো মুছতে গেলেই চোখ গেল আয়নায় তার পেছনে থাকা মানবের দিকে। চোখের মণি যেন সেখানেই স্থির হলো। প্রতিবারের মতো তৃপ্তি ভরে তাকিয়ে থাকলো দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠাম শরীরে সাদা শার্ট পরিহিত নিশানের দিকে। নিশান দুহাত বুকে গুঁজে বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে আয়নায় চোখ রাখা শৈলীর দিকে। নিশান আজও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু শৈলী জানে, এই নির্লিপ্ত ভঙ্গির আড়ালে লুকিয়ে আছে অগণিত প্রশ্ন, বিস্ময়, হয়তোবা কিছু অভিযোগও। মেয়েটার গলা শুকিয়ে এলো। সে জানে, নিশান কখনোই কোনো কিছু অকারণে বলে না, আর একবার বললে সেটার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত থামেও না। আয়নায় চোখ রাখা শৈলীর কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। নিশানের দিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়েও তাকাল না, বরং আয়নায় তাকিয়েই ঠোঁট নড়াল, " আপনি.....? " নিশান এবার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি টেনে আনল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না। বরং কেমন যেন বিদ্রুপ মেশানো এক অনুভূতি। খুব শান্ত স্বরে বলল, " কেনো? আসতে পারি না? ওই লু'চ্চাটা আসলে ভালো লাগতো তোর?" শৈলী এবার আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সোজা নিশানের দিকে তাকাল। এভাবে একদম সপ্রতিভভাবে চোখে চোখ রেখে তাকানোর সাহস তার খুব কমই হয়। কিন্তু আজ সে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাল না। নিশান তাকিয়ে ছিল, তাকিয়েই রইল। এক গভীর, কঠিন দৃষ্টি। অবশেষে নিশানই নড়ল। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের একপাশে ভর দিয়ে দাঁড়াল, শৈলীর একেবারে পাশে। তার কণ্ঠস্বরে এক ধরনের দৃঢ়তা ভেসে এলো, " তুই এত বোকা কেনো?" শৈলী ড্যাবড্যাব করে তাকালো। অপমানিত হলো কিনা বোঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না। অবশ্য কখনো পারেও না। এই পুরুষের অভিব্যক্তি হয়তো সে সাতবার জন্ম নিলেও বুঝতে পারবে না। নিশান একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। যেন নিজের ধৈর্যকে সংযত করার চেষ্টা করছে। তারপর একেবারে কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, " সেই দুবছর থেকে এত কষ্ট পাওয়ার পরও কিছু বলিস না। এত অন্যায় সহ্য করিস, কিন্তু একটা শব্দও উচ্চারণ করিস না। কেনো শৈলী? এতটা নিরুপায় তুই কবে থেকে?" শৈলীর চোখ কপালে উঠে গেল। নিশানের স্বরে আজ এক অন্যরকম শূন্যতা, এক ধরণের হতাশা। কিন্তু সে কিছু বলল না। ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। নিশান এবার ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা পানি ভর্তি গ্লাসটা হাতে নিল, তারপর সেটার ভেতরে আঙুল ঘুরিয়ে বলতে থাকল, "তোর কী মনে হয়? আমি এসব দেখে চুপচাপ থাকব? এতদিন ছিলাম, তার অবশ্য কারন ছিল। তবে এখন তোকে এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে দেব না।" শৈলীর শ্বাস এক লাফে দ্রুত হয়ে এল। "আপনি…আপনি এসব কী বলছেন?" নিশান এবার গ্লাসটা রেখে সোজা শৈলীর দিকে তাকাল। গভীর, দৃঢ়, অবিচল দৃষ্টি নিয়ে। "তুই আর এই বাড়িতে থাকবি না। কাল সকালে তোর সবকিছু গুছিয়ে নিবি। এরপর তুই চলে যাবি এখান থেকে। তোকে আমি বাংলোতে রেখে আসবো।" শৈলী ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া মোমের ন্যায় অনুনয় করে বলল, " এমন বলবেন না প্লিজ। আমি এখানেই থাকবো। আমার কোনো সমস্যা নেই। সত্যি বলছি।" নিশান এবারো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিজের ঘড়ি নেড়ে দেখতে দেখতে বলল, " আমার সমস্যা আছে। আমি এসব আর দেখতে পারব না। আর তুই জানিস আমি মায়ের সাথে জোরাজোরি করতেও পারব না৷ সুযোগ পেলে তোকে জোর করে আবারো বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। আমিও মামনির মতো চাই তুই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করিস। কিন্তু মা যেভাবে শুরু করেছে....." শৈলী ঢোক গিলে মাথা নেড়ে বলে, " করুক। আমি থাকবো। কোনো সমস্যা নেই। মামনি আছে তো...!" নিশান ভ্রু কুঁচকে বলল, " তবুও থাকবি?" শৈলী একটু হাসার চেষ্টা করে বিষাদ গলায় বলল, " আমি সহ্য করতে পারব, নিশান ভাই। " " কিন্তু আমি যে তোর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারব না।" যন্ত্রের মতো বলেই মুহুর্তে নিশান চুপ করে গেল। যেন নিজেই বুঝতে পারছে না, ঠিক কী বলে ফেলেছে। গলা স্বরটা কেমন যেন আটকে এলো, চোখ নামিয়ে ফেলল শৈলীর দিক থেকে। শৈলী বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। নিশানের কণ্ঠে লুকিয়ে থাকা সেই অচেনা অনুভূতিটা তাকে আরও অস্থির করে তুলল। সে কি সত্যিই এই কথাটা বলার জন্য বলেছে, নাকি মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে? নিশান এবার চোখ বুঁজে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। তারপর একটু পাশ ফিরল, যেন নিজের মনের অস্থিরতাকে গোপন করার চেষ্টা করছে। "ভুলে যা। কিছু বলিনি আমি।" শৈলী কাঁপা গলায় বলল, "আপনি.... আমার জন্য এত চিন্তা করছেন কেন?" নিশান এবার হাসল, " শোনো বোকা মেয়ে, কিছু কিছু জিনিস না জানাই উত্তম। কেও নিজে থেকে উপলব্ধি না করলে আমি জোর করে তাকে কিছু বোঝাতে পারব না, বোঝাতে চাইও না। বেশি ভাবার দরকার নেই। জলকে শরবত বানিয়ে ফেলো না যেনো!" শৈলীর ঠোঁট শুকিয়ে এল। নিশান আবার তার দিকে তাকাল, গভীর চোখে। "আমি তোর সব ব্যথা সহ্য করতে পারব না, শৈলী। কখনো পারিনি। পারবও না। কারনটা জিজ্ঞেস করিস না। এর কারন ব্যাখ্যা করতে গেলে অনেক নিষিদ্ধ কিছু করতে হবে আমায়!" বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না এই পুরুষ। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, যেন তার নিজের কথাগুলোকেই সে সহ্য করতে পারছে না। শৈলী চোখ বড় করে দরজার দিকে তাকিয়েই রইলো। আচ্ছা, নিশান ভাই কি অনুভূতি চেপে পালালো?
