প্রেমের লাল ছোয়া পর্ব ১
প্রেমের লাল ছোয়া
বেড পারফরমেন্স কেমন তোমার? আগে কখনো করেছো? নাকি ভার্জিনিটি আছে? ” নিজের হবু বরের মুখ নিঃসৃত এমন প্রশ্নে বিস্ময়ে জমে গেল শৈলী। তৎক্ষনাত চমকে তাকালো সামনে ফিটফাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির দিকে। মনে হলো যেন, কানের কাছে কেউ বাজ ফাটিয়েছে। সে কি ভুল শুনল? হতে পারে, অবশ্যই ভুল শুনেছে! কিন্তু যখন সামনে বারান্দায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার ঠোঁটে একপ্রকার তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি ফুটে উঠল, তখনই শৈলী বুঝল, না, ভুল কিছু শুনেনি সে। ভেতরটা কেমন যেন অস্বস্তিতে গুটিয়ে গেল তার। হাতের আঙুলগুলো নিজের অজান্তেই শক্ত হয়ে মুঠোয় পরিণত হলো। শৈলীর কণ্ঠ যেন নিজেকেই অপরিচিত ঠেকল, " মানে?" অয়ন বেশ নির্লিপ্ত জবাব দেয়, " আই মিন, জানতে চাচ্ছি তুমি নিজের ভার্জিনিটি রেখেছো কিনা? আজকালকার মেয়েদের উপর তো ভরসা করা যায় না।" কন্ঠে বেশ অবজ্ঞা ফুটে উঠলো। চোখের কোণায় পানি জমলো শৈলীর। তবে দুঃখের নয়, তাচ্ছিল্যের। ঠোঁট কাঁমড়ে নিজের নিয়তির উপহাস করে বাঁকা হাসলো সে। অন্য ঘরে পাত্রের সাথে আলাদা কথা বলতে এসে এমন পরিস্থিতিতে পরতে হবে ভাবেনি যে। আসলে বাবা মা ছাড়া পৃথিবীতে কেউ আপন নয়- এটা শৈলী তখনই বুঝতে পেরেছে যখন সে তার বাবাকে নিজের স্বাভাবিক জীবন থেকে হারিয়েছে, আর মাকে পৃথিবী থেকে। ------~ শৈলী একেবারে অনন্য রূপের অধিকারী নয়, তবে কুৎসিতও বলা যায় না। তার চোখ দুটো গভীর অন্ধকার রাতের মতো, যা প্রতি মুহূর্তে কিছু বলতে চায়, তবে শব্দের জন্য অপেক্ষা করে। মুখাবয়বে কোনো এক ধরনের আলাদা বৈশিষ্ট্য, যেমনটা সচরাচর খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠোঁটগুলো সজীব এবং মধুর, প্রায় সবসময় হাসি লুকিয়ে রাখতো। তবে আজ, সেই হাসি ছিল শীতল এবং মুখের গড়ন এক ধরনের অদ্ভুত গম্ভীরতায় আচ্ছন্ন। মসৃণ ত্বক, সুগঠিত শরীর, এবং সোজা দাঁড়িয়ে থাকা গঠন তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলে। তার চুল সোনালী শ্যামলা, কোমর অব্দি ছড়িয়ে পড়া। শান্ত কিন্তু শক্তিশালী উপস্থিতি তার, যেন প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে প্রমাণ করতে প্রস্তুত। সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক নয়, ভেতরেও এক অনন্য দৃঢ়তা। শৈলীর জীবনে একটি গভীর শূন্যতা ছিল, যা কখনো পূর্ণ হতো না। তার মা যখন সে মাত্র পাঁচ বছর বয়সী ছিল, তখনই মারা যান। মা ছাড়া সে অনেক দিন বেঁচে ছিল, তার বাবার সঙ্গেই কাটিয়েছিল তার শৈশব এবং কৈশোরের বেশিরভাগ সময়। কিন্তু গত বছর তার বাবা প্যারালাইজড হয়ে পড়েন, আর সেই মুহূর্ত থেকে তার জীবনে পরিবর্তন আসে। তার জীবনের বোঝা আরও বাড়তে থাকে। যৌথ পরিবারের মধ্যে বাস করার কারণে, সবাই তার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। তার চাচি ও চাচা, যারা তার প্রতি এক প্রকার নির্দয় মনোভাব পোষণ করত, তার ওপর একপ্রকার জোরজবরদস্তি চালাতে থাকে। তারা চেষ্টা করছিল তাকে একতরফাভাবে বিয়ে দিতে, যেন তার ভবিষ্যত পুরোপুরি তাদের হাতে চলে আসে। শৈলী জানত, তার কাছে এখন আর কোনো নিরাপত্তা নেই। সে অনুভব করছিল, এক সময়ের স্নেহময় বাবা, এখন শয্যাশায়ী, তাকে আর আগের মতো সঙ্গ দিতে পারছে না। আর তার চাচি ও চাচা, যারা শুধু তার শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করছিল, তাকে কেবল একটা জীবন্ত পুতুল মনে হচ্ছে। -------- " অ্যাই হ্যালো? " অয়নের কথায় শৈলী নিজের চিন্তার জগৎ থেকে সন্তপর্ণে বেরিয়ে আসলো। চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য ফাঁকা হয়ে গেল তার, শরীর এক সেকেন্ডের জন্য যেন স্থির হয়ে গেল। হঠাৎ যেন সেই স্বপ্নালু মুহূর্তটা ছিন্ন হয়ে তার চোখে পৃথিবী আবার স্পষ্ট হয়ে উঠল। ভদ্র মানুষের রূপ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অয়নের দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকালো শৈলী। অয়ন এবার থুতনিতে আঙুল ঘষে কিছুটা নিরাশ হয়ে তাচ্ছিল্য বলে উঠলো, " কী হলো, চুপ কেনো? শীট! তার মানে তুমি ইউজ করা মা'ল?" আর সহ্য হলো না শৈলীর। চোখ বড় করে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো, " কী বলছেন আপনি? এসবের মানে কী?" একগাল হাসলো অয়ন। মুখে শয়তানির ছাপ স্পষ্ট। "মানে খুব সাধারণ। সংসার মানিয়ে চলার জন্য তো অনেক কিছু জানা দরকার, তাই না? এই ব্যাপারগুলো কি জানার প্রয়োজন নেই? ডোন্ট ওরি, তুমিও আমার বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারবে।" শৈলীর গলা শুকিয়ে এলো। তার শরীরের প্রতিটি নার্ভ টানটান হয়ে গেল। কী বলছে এই লোক! এটা কি কোনো রকমের বাজে মজা, নাকি সত্যিই সে এমন ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস রাখে? ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। পাশের ঘরে নিশ্চয়ই তার চাচা-চাচি অধীর আগ্রহে বসে আছেন, এই কথোপকথনের বিষয়ে সম্পূর্ণ অজানা। অথচ এখানে, এই চার দেওয়ালের মধ্যে, সে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি যা তার কল্পনাতেও ছিল না। শৈলীর মনে হলো, এখনই উঠে দাঁড়িয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যেতে হবে। অথবা.... আজ এই মুহূর্তে যদি তার বাবা-মা বেঁচে থাকত, তাহলে শৈলী নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সামনে থাকা এই নোংরা লোকটার গালে চড় মারতো। কিন্তু সে জানে, এখন যদি সে এই লোকটার সাথে একটুও অভদ্রতা করে, তবে আজ সে আবারো অত্যাচারিত হবে, প্রতিবারের মতো এবারও যদি পাত্রপক্ষ হাতছাড়া হয়ে যায়, তবে তার চাচি তাকে মে'রেই ফেলবে। আপনজনের অভাব যে আজ খুব টের পাচ্ছে শৈলী। তবে হ্যাঁ। একজন আছে। একজন মানুষ আছে যে থাকলে তাকে এখন কেও এভাবে নোংরা ভাবে অপমান করতে পারত না। কিন্তু সে কখন আসবে? সে কি আসলেই আসবে? শৈলীর হাতের আঙুল আবার শিথিল হলো, চোখ দুটো কঠিন হয়ে উঠল। গলা যথাসম্ভব শক্ত করে বলল, " আপনার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। প্রথমে ভদ্রলোক ভেবেছিলাম। আপনার মা-বাবা কি এসব প্রশ্ন করার জন্যই আপনাকে পাঠিয়েছেন?" অয়ন এবার ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে হাসল। যেন মজা পেয়েছে। যেন ঠিক এই প্রতিক্রিয়াটাই সে আশা করছিল। " ইউ নো হোয়াট, আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম তুমি একটা গাইয়া মেয়ে। তোমার মত গাইয়াকে কেউ বিয়ে করবে না। দেখতেও তো খুব একটা ঝাক্কাস নও তুমি। সো আমার মনে হয়, যদি সংসার করার ইচ্ছে থাকে তাহলে আমার সাথেই করতে হবে। আর হ্যাঁ তুমি ভার্জিন থাকো আর না থাকো, আই ডোন্ট কেয়ার। কারণ আমি নিজেও ভার্জিন নই। আর তোমাকেও আমি পার্মানেন্টলি বিয়ে করব না। তোমার চাচা চাচি যদি যৌতুকের টাকাটা না বাড়ায়, তবে আমি একমাস পর তোমায় ডিভোর্স দিয়ে দেবো। যদি ডিভোর্স দিতে নাও পারি তবে আমার গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে আমার বাড়িতেই থাকব আর তুমি রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে। বলো, রাজি?" শৈলী চুপ থাকলো, চোখে এক তীব্র যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু তার শরীরে কোনো আন্দোলন নেই। একের পর এক কথা শোনার পর, তার ভিতর গড়ে উঠছে এক ধ্বংসাত্মক শান্তি। শৈলী ঠোঁট চেপে হাসলো, সেই হাসি বেজায় তিক্ত, যেন নিজের ভেতর সমস্ত তিক্ততা কুড়িয়েছে। অয়ন এবার বেশ তীক্ষ্ণ চোখে শৈলী কে উপর নিচ ভালো ভাবে দেখতে থাকলো। তার তাকানোর ধরণ দেখে শৈলী ভীত হলো, শাড়ি টেনে নিজেকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকলো। সে মোটেই এরকম হাতা কাটা ছোট ব্লাউজ আর পাতলা শাড়ি পরেনা। কিন্তু আজ তার চাচি খুন্তি দিয়ে ছ্যাকা দিয়েছে তার পায়ে। যে কারণে বাধ্য হয়ে তাকে পড়তে হয়েছে এই পোশাক, সাথে সাজতেও হয়েছে। নিজেকে আড়াল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে থাকা শৈলীর ভীষণ রকম কান্না পাচ্ছে। আজ যদি তার বাবা ঘরের এক কোণে পড়ে না থেকে স্বাভাবিক থাকতো তাহলে এরকম পরিস্থিতিতে কখনোই পড়তে হতো না শৈলীকে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টায় আছে সে। অয়ন এবার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখা শেষ করে ধীর পায়ে একটু এগিয়ে এসে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে ওঠে, " বডি ফিগার খুব একটা খারাপ না। জোস ফিগার বানিয়েছো। আই লাইক ইট। আচ্ছা.. তোমার বডি সাইজ কত?" শৈলী ঘৃণায় চোখ খিঁচে বন্ধ করলো। এসব কথা সে আর শুনতে চায় না। তবে অয়নের প্রশ্ন বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চাপা কন্ঠের জবাব ভেসে আসলো। " আমি বলছি ওর বডি সাইজ........" পরিচিত পুরুষালী তীক্ষ্ণ কন্ঠে তৎক্ষনাত চোখে ঝিলিক স্পষ্ট হলো শৈলীর। মুখে হাসির রেখা টেনে বিস্ময়ে তাকালো দরজার দিকে। কথার ব্যাঘাত ঘটায় অয়নও বিরক্তিতে তাকালো দরজার দিকে। স্পষ্ট হলো নিঁখুতভাবে নির্মিত কঠিন এক পুরুষের অবয়ব। ছায়ায় ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে থাকলো একটি সুঠাম, আকর্ষণীয় পুরুষ, যে কিনা দুহাত পকেটে রেখে বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পা ফেলে শব্দ করে নিরবতার মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করে এগিয়ে আসছে। শৈলী এক হাতে বেশ অবহেলায় চোখ মুছলো। মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলো সদ্য আসা মানুষটিকে দেখার। অয়ন চোখ সরু করে ছায়ার আড়াল থেকে দেখতে চেষ্টা করল আগন্তুক কে। বেশ বিরক্তির স্বরে বলল, " কে রে ওখানে? আশ্চর্য! এই বাড়ির কেউ কি ম্যানার্স জানেনা? পাত্র-পাত্রীকে আলাদা রুমে কথা বলতে পাঠানো হয়েছে, আর এখানে এসে কেউ কথার মাঝে নাক ঢোকাচ্ছে। কে রে ওখানে? " শৈলী একটা সস্থির ঢোক গিলে হাসিমুখে বিড়বিড় করে আওড়ালো, " নিশান ভাই.. " জুতার শব্দে সারা ঘরে এক ধরনের অদ্ভুত গম্ভীরতা ছড়িয়ে পড়ল। কারো আগমনে সারা ঘর যেন থমকে গেল, শুধু তার পদধ্বনিতেই মন্ত্রমুগ্ধ হলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে অবয়বটা, তার সোজা গড়ন আর শক্তিশালী পেশীর গঠন তার উপস্থিতিকে আরও দৃঢ় করে তুলছে। সুঠাম, পরিপূর্ণ শরীর যেন সবকিছুতেই নিখুঁত ভারসাম্য তার। সাদা শার্ট পরিহিত নিশানের মুখের রেখা খুব স্পষ্ট, তীক্ষ্ণ, এবং চোখ দুটি যেন কাচের মতো ঝলমল করছে, স্বচ্ছ এবং একাগ্র। তবে এখন দেখে মনে হচ্ছে কেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে চোখে। দুহাত পকেটে রাখা, মাথা কিছুটা নিচে রেখে চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে আসতে থাকলো এক অপ্রতিরোধ্য পুরুষ নিশান তালুকদার। চোয়াল শক্ত করে রাখা নিশানকে দেখে অয়ন মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, " কে আপনি?" নিশান একবার শৈলীর দিকে তাকায়। মেয়েটার চোখে হাজারো পাখি ফুরফুরে হয়ে উড়ে যাচ্ছে যেন। এত কীসের আশা মেয়েটার, এত কীসের আকাঙ্ক্ষা! অয়ন ভ্রু কুঁচকে আবারো একই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলে নিশান ধীর কন্ঠে নিজের পরিচয় জানান দেয়, " নিশান...নিশান তালুকদার। " তালুকদার বংশ শহরে বেশ সমাদৃত। ব্যবসায় বেশ এগিয়ে থাকায় মর্যাদাও খুব বেশি। মূলত এই কারনেই তো অয়নের বাবা আশরাফ উদ্দীন বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে এ বাড়ির সাথে আত্মীয়তা করতে চেয়েছে। শৈলীর চাচী খাদিজার লোভকে কাজে লাগিয়ে নিজের অকর্মা ছেলের জন্য খুঁজে নিয়েছে পাত্রী। তাই নিশানের নামে তালুকদার শুনে অয়ন বুঝতে পারল সে এই বাড়িরই সদস্য। আর তাছাড়া এখানে আসার আগে সে নিশানের নামও শুনেছে৷ বাপ চাচার সাথে ব্যাবসায় সেও হাত লাগায়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাই অয়ন এবার ভদ্রতার খাতিরে মেকি হেসে বলল, " ওও আচ্ছা, আপনি। নাম শুনেছি আপনার নিশান ভাই। চিনতে পেরেছি।" নিশানের অভিব্যক্তি বোঝা গেল না৷ সে একই ভাবে চোখ মুখে আঁধার নামিয়ে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দৃষ্টি একদম সামনে। অয়ন এবার শৈলীকে উদ্দেশ্য করে নরম কন্ঠে বলল, " তোমার চাচাতো ভাই হবে, তাই না?" শৈলী প্রথমে আমতা আমতা করলো। এই প্রশ্নের জবাব দিতে তার মোটেই ইচ্ছে করে না। কখনোই না। কিন্তু কারনটাও জানা নেই। অসস্তিতে হাত কঁচলে শৈলী ডাগর ডাগর আঁখি তুলে তাকালো নিশানের দিকে। চোখে চোখ পড়ল এবার। নিশানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পরখ করে প্রথমে কিছু না বুঝলেও ছোট্ট মাথায় শাড়ি আর সাজগোজের চিন্তা আসতেই আবারো শাড়ি নিয়ে টানাটানি শুরু করে শৈলী৷ আজ তার রক্ষে নেই। অনেকক্ষণ পর নীরবতার বেড়িবাঁধ ভেঙে নিশান ভ্রু কুঁচকে বেশ বিরক্তি ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করল, " তুমি কী করছো এখানে?" অয়ন অবুঝের ন্যায় মাথা নাড়াল। দেখতে পাওয়ার পরেও প্রশ্ন করছে কেনো এই লোক। মাথাটাথা খারাপ আছে নাকি। তার ইচ্ছে হলো নিশানের মুখের উপর জবাব দিতে। কিন্তু এলাকায় নিশানের ক্ষমতা সম্পর্কে অনেক কাহিনী শুনেছে অয়ন। এমনিতেই অনেক রাগী আর মারপিটে নাকি আমেরিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে এসেছে। ঝুঁকি নিতে মোটেই ইচ্ছুক নয় অয়ন। তাই ভদ্র ভাবে মাথা এলিয়ে জবাব দিল, " ইয়ে মানে ওইযে আমাদের কে তো আলাদাভাবে কথা বলতে পাঠানো হলো। আগামী সপ্তাহে আমাদের বিয়ে....!" কথা শেষ করতে পারল না অয়ন। নিশান কন্ঠ যথাসম্ভব খাদে নামিয়ে ফের শুধালো, " কার বিয়ে?" " আমাদের.." অয়নের বলতে দেরি হলো চোখ সরু করে থাকা নিশান শার্টের হাতা গোটাতে দেরি করলো না। বেচারা অয়ন নিশানকে শার্টের হাতা গোটাতে দেখে খানিক বিভ্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি ভীত হলো। সে তো রেগে যাওয়ার মতো কিছু বলেনি, তবে এই লোক এমন প্রস্তুতি নিচ্ছে কেনো? নিশানের হাতের গঠন দেখে ঢোক গিলল অয়ন। নিঃসন্দেহে এই পুরুষকে বলবান বলা যায়, হাতের পেশির উচ্চকিত ভাঁজ দেখে মনে হয়, এ হাতে একবার ঘুষি পড়লে সেটা সহজে ভুলে থাকা সম্ভব নয়। অয়ন ধীরে ধীরে পিছু হটতে শুরু করল, মুখে শুকনো হাসি এনে বলল, " ম...মানে আমাদের বলতে আমি আর শৈলী... ইয়ে, আমাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে।" নিশানের মুখের অভিব্যক্তি এতটুকু বদলালো না, শুধু চোয়ালের কাছে শিরাগুলো স্পষ্ট হলো। এক নিঃশ্বাসে ধীর গলায় বলল, " তোমাদের বিয়ে কে ঠিক করেছে?" অয়ন এবার দ্বিধায় পড়ে গেল। ভালোই ফ্যাসাদে পড়ল তো সে। এ আবার কেমন অদ্ভুত কথা। মুখের হাসি ঝুলিয়েই ইতস্তত করে সে বলল, " বড়রা ঠিক করেছে... মানে আমার বাবা মা আর... এই বাড়ির বড়রা।" নিশান এবার এক পা এগিয়ে এল, এতটাই কাছাকাছি যে অয়ন অজান্তেই আরও এক কদম পিছিয়ে গেল। নিশান হাত দুটো বুকের সামনে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে চোখ সরু করে তাকে পরখ করতে লাগল, যেন এক মুহূর্তের ভেতর অয়নের হাড়গোড়ের গঠন পর্যন্ত দেখে নিতে চায়। তারপর খুব ধীর কণ্ঠে বলল, " বড়রা ঠিক করেছে? বেশ ভালো। আর তোমার মতলব?" শৈলী নিশানের গলার স্বর শুনে আঁতকে উঠল। এতক্ষণ সে চুপ ছিল, কিন্তু এখন মনে হলো পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে। খাদিজা তালুকদার জানতে পারলে নিশানের উপরেও খেপে যাবে ভেবে শৈলী দ্রুত নিশানের একটু কাছে এসে দাঁড়ালো, যেন তার ক্রোধের সামনে একটা ছোট্ট বাধা তৈরি করতে চায়। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, " নিশান ভাই, প্লিজ...!" কিন্তু নিশান এবার শৈলীর দিকে তাকালো না, চোখ বরাবরই অয়নের ওপর ছিল। ঠোঁটের কোণে একপাশে বিদ্রুপের রেখা টেনে রাগান্বিত অভিব্যক্তি নিয়ে বলল, " এতক্ষণ যেভাবে চুপচাপ খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে ছিলি, সেভাবে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাক। একটা কথা বলতে আসলে তোর পায়ের টেংরি ভেঙে রেখে দেব আমি।" তৎক্ষনাত বাধ্যের ন্যয় মাথা নিচু করে ফেলা শৈলী ভয় পেল কিনা বোঝা গেল না৷ তবে অয়ন এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। নিশানের শরীরের প্রতিটা পেশী এখন যেন বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কপাল দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ল। সে একবার শৈলীর দিকে তাকাল, তারপর জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলল, " আরে ভাই, আমি তো ওর সাথে মজা করছিলাম! এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই! আমি একটু... যাই তাহলে!" এক মুহূর্ত দেরি না করেই দ্রুত দরজার দিকে পা বাড়াল অয়ন। কিন্তু দরজা থেকে বের হতে না হতেই পেছন থেকে গম্ভীর, অথচ শীতল কণ্ঠস্বর এল, " থামো।" অয়ন থমকে দাঁড়াল। শৈলী বিড়বিড় করে আওড়ালো, " বলদের নানা, এতক্ষণ যে তেজ দেখাচ্ছিলি! আর এখন পালাই পালাই করছিস কেনো? পায়ের তলায় কি গরম লোহা পড়েছে? " নিশান এবার ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এল, অয়ন টের পেল, তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। চাইলেও এখন পালাতে পারবে না, ভয়ে গলা দিয়ে আওয়াজও বের হচ্ছে না, নইলে এক চিৎকার দিয়ে লোক জড়ো করতো। নিশান এবার একদম তার কানের কাছে এসে নরম অথচ শীতল স্বরে বলল, " শোন ছোট ভাই, শৈলীর বডি সাইজ বা ওর সম্পর্কে, সেটা তোর বা তোর বাপের জানার দরকার নেই। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখিস, এই বাড়ির মেয়ের ওপর খারাপ নজর দেওয়ার আগে আমার সাথে পার্সোনালি দেখা করিস। কারণ তুই যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছিস, ওখান থেকে বের হতে হলে হেঁটে নয়, হামাগুড়ি দিয়ে বের হতে হবে। বুঝেছিস?" অয়ন দ্রুত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। নিশান এবার একপাশে সরে দাঁড়াল, ইঙ্গিত করল, "এখন যেতে পারো। তবে শুধু ঘর থেকে নয়, গুষ্টি শুদ্ধো যেভাবে এসেছো সেভাবেই ভদ্রলোকের মত বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। কোনো বিয়েটিয়ে হবে না।" অয়ন দ্বিতীয়বার সময় নষ্ট করল না। প্রাণ বাঁচাতে যত দ্রুত সম্ভব দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল, যেন দেরি হলেই নিশান সত্যিই তাকে হামাগুড়ি দিয়ে বের করে দেবে। শৈলী নিশানের দিকে তাকিয়ে ছিল, সে জানে, নিশান এমন রাগান্বিত হলে কারও পক্ষেই তাকে থামানো সম্ভব নয়। নিশান ধীরে ধীরে শার্টের হাতা ঠিক করল, মুখের কঠোর রেখাগুলো অমোঘভাবে শৈলীর দিকে ফিরে এলো। একদম শান্ত কিন্তু তিরিক্ষি গলায় বলল, " চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখছিলি? নোংরা কথাগুলো শুনে খুব ভালো লাগছিল, তাই না?" শৈলী চোখ নামিয়ে নিল। কিছু বলল না। এখন মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের করা মানে সিংহের কাছে বিসর্জন দেয়া। শৈলীর নীরবতা যেন নিশানকে কথা বলার আরো সুযোগ করে দিল। বাজখাঁই গলায় আবারো চোয়াল শক্ত করে বলল, " এমনিতে তো চেটাং চেটাং করে মুখ থেকে কথা বের হয়, আর কাজের সময় কি মুখে স্কচটেপ লাগানো থাকে? হাত উঠে না? চড় মারতে পারিস নি?" শৈলী ঠোঁট উল্টে ছলছল নয়নে চেয়ে রইলো নিশানের দিকে। এই লোক সবকিছু জেনেও এমন করছে! সে তো জানেই যে শৈলী নিশানের মা খাদিজা তালুকদারের ওপর একটা কথা বললে তার গায়ে নির্মম ভাবে হাত তোলা হবে। শৈলীর চোখের ভেতর জমে থাকা অশ্রুগুলো ঠিকঠাক বুঝতে পারছিল নিশান, কিন্তু তার মুখে কোনো নরমতা এল না। বরং কণ্ঠটা আরও কঠিন হয়ে উঠল, " আমি কি তোর জন্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকব, আর তুই বসে বসে চোখের পানি ফেলবি? " শৈলী এবার সত্যিই কষ্ট পেল। নিশান কি জানে না, সে কতটা অসহায়? সে কি বোঝে না, এখানে তার কোনো অধিকার নেই কথা বলার? নিশান কি ভুলে গেছে, এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে শৈলীর নির্বাক বেঁচে থাকার ইতিহাস লেখা? শৈলী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে গভীর শ্বাস নিল, তারপর ঠোঁট শক্ত করে ফিসফিস করল, " আমি কিছু করিনি নিশান ভাই।" নিশান এবার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। এতটা কাছে, যেন তার শ্বাস শৈলীর গালে লাগছে। গভীর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে বলল, " এত পাতলা শাড়ি আর ছোট ব্লাউজ পড়েছিস কেন?" তড়িঘড়ি করে সাফাই গাইতে থাকলো শৈলী, " বিশ্বাস করুন নিশান ভাই, আমি পড়তে চাইনি। একদম চাইনি। বড় মা পড়তে বলেছিল....আর পড়তে চাইনি বলে পায়ে..." বলতে বলতেই থেমে গেল শৈলী। পায়ে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেয়ার কথাটা বললে বাড়িতে আবার অশান্তি হবে। সবার ভালোর কথা ভেবে মুখে লাগাম টেনে মাথা নিচু করে ফেলল সে। নিশান থমকে গেল। তার চোয়াল শক্ত হলো, ভ্রু কুঁচকে গেল। শৈলীর থেমে যাওয়া বাক্যটা দক্ষ মস্তিষ্ক ঠিকই ধরতে পারল। ধীরে ধীরে তার চোখ নামল শৈলীর পায়ের দিকে। এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল নিশানের ভেতর। আঁচলের আড়ালে লুকিয়ে রাখা জায়গাটা সে স্পষ্ট দেখতে না পেলেও বুঝতে পারল। এইটুকু মেয়েটাকে ওরা আবারো এতটা নির্দয়ভাবে শাস্তি দিয়েছে? শুধু একটা শাড়ি না পড়ার জন্য? নিশানের কণ্ঠ নিচু হলেও গম্ভীর, রাগে ঠাসা, " পা দেখা।" শৈলী তড়িঘড়ি মাথা নাড়িয়ে পা পেছনে সরিয়ে নিল, " না, লাগবে না নিশান ভাই। ভালো হয়ে গেছে।" নিশান ঠোঁট চেপে ধরল। পায়ের অবস্থা না দেখলেও সে নিশ্চিত, দাগ এখনো রয়ে গেছে। কণ্ঠের খাদ আরও নিচু করে আদেশ ছুঁড়ে বলল, " দেখাতে বলেছি।" শৈলী এবার সত্যিই ভয় পেল। নিশানের চোখের আগুন সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সে জানে, নিশান যদি রেগে যায়, তবে এই বাড়িতে আরেকটা ঝড় উঠবে। তাই কাঁপতে কাঁপতে ধীরে ধীরে তার আঁচল সরিয়ে পায়ের পাতা সামনে করল। লালচে পোড়া দাগ এখনো স্পষ্ট। কিছু জায়গা কালচে হয়ে গেছে। নিশানের মুঠি শক্ত হলো, এতটাই শক্ত যে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেল বলে মনে হলো। ঠান্ডা গলায় বলল, " কে করেছে?" শৈলী মুখ তুলে তাকাল না, সে কি এখন গলা উঁচিয়ে নিশানকে বলবে যে তার মা করেছে এই কাজ। মা ছেলের মধ্যে এমনিতেই দ্বন্দ্ব। আর ঝামেলা বাড়াতে মোটেই ইচ্ছুক নয় সে, আস্তে করে শৈলী কন্ঠ নামিয়ে বলল, " কিছু হয়নি, নিশান ভাই।" নিশান এবার এতটাই রেগে গেল যে, পাশের টেবিলে রাখা রঙিন ফুলদানিটা এক ঝটকায় ছুঁড়ে মারল দেয়ালে। চুরমার শব্দে শৈলী আঁতকে উঠল, শরীর কেঁপে উঠল তার। নিশান সামনে ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে বলল, " কিছু হয়নি? কিছু হয়নি মানে টা কী? দু বছর ধরে এসব দেখছি৷ কিছু হয় নি, সব ঠিক আছে, এই কথাগুলো তোর ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে? মুখ বন্ধ রাখতে, কষ্ট গিলে ফেলতে? এখনো পারছিস? আমাকে নিজের মতো আহাম্মক ভাবিস?" শৈলীর চোখে পানি জমে গেল। সে কিছু বলল না। নিশান গলা শক্ত করে বলল, " আজ পা পুড়িয়েছে, কাল পুরো শরীরও জ্বালিয়ে দিতে পারে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এগুলো সহ্য করবি। কে করেছে এটা?" " বড় মা..!" ফিসফিস করে বলা দুই শব্দটা মোটেই অচেনা ঠেকলো না নিশানের কাছে। তবে নিজের মায়ের এমন নির্মম কর্মকাণ্ডে সে সত্যিই খুব বিরক্ত। শৈলীর প্রতি তার মায়ের কীসের ক্ষোভ, বুঝতে পারে না নিশান। আবার কোনো এক অজানা কারনে খাদিজা তালুকদার এখন যে কোন মূল্যে শৈলীর বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। এই নিয়ে দু বার নিশান শৈলীর বিয়ে ভাঙতে আসলো। মাকে ভীষণভাবে শ্রদ্ধা করা নিশান খাদিজা তালুকদার এর উপর কোন কথাও বলতে পারে না। আর এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। নিশান তখনো দাঁড়িয়ে, কঠিন চোখে শৈলীর দিকে তাকিয়ে আছে। আর শৈলী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, চোখের পানি আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। নিশান একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল, তারপর শান্ত গলায় বলল, " আর কিছু করেছে?" শৈলী দু'দিকে মাথা নাড়ে। নিশান ধীর কণ্ঠে বলল, " আমার কাছ থেকে কিছু লুকাস না, শৈলী। কারণ তুই নিজেও জানিস, তুই না বললেও আমি সবকিছু বুঝতে পারি।" শৈলীর বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। নিশান এখনও তার জন্য আগের মতোই আছে... সব অনুভূতি বুঝতে পারে। কিন্তু সে কি সত্যিই সব বুঝতে পারবে?যদি পারত, তাহলে কি এভাবে শুধুই প্রশ্ন করত? শৈলীর বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা বাজতে লাগল। এত বছর ধরে সে সহ্য করে এসেছে, মুখ বুজে থেকেছে। শুধু এই আশায় যে কেউ তার ব্যথা বোঝার চেষ্টা করবে না, প্রশ্ন করবে না। কিন্তু নিশান? সে এত সহজে হার মানবে না। শৈলী আস্তে করে চোখ তুলল। নিশান তখনো তাকিয়ে আছে, চোখের গভীরে একরকম হাহাকার নিয়ে। " নিশান ভাই..." শৈলীর গলাটা কেঁপে উঠল। " আপনি তো জানেন, আমি আপনাদের কাছে কেবল একটা বোঝা। বড় মা আমাকে কখনোই মেনে নেননি। আপনি বড় মা কে কিছু বলবেন না। " নিশান ঠোঁট শক্ত করল, চোখের পলকও ফেলল না। " আমার কথার উত্তর দে, শৈলী। আর কিছু করেছে?" শৈলী নিঃশ্বাস ফেলল। মাথা নিচু করে বলল, " উহু, কিছু না। আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি।" নিশানের মুখে হালকা হাসির মতো কিছু একটা ফুটল, তবে সেটা বিদ্রুপে ভরা। " অভ্যস্ত হয়ে গেছিস? খুব ভালো। " শৈলী তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। নিশান এবার প্রথমবারের মতো শৈলীর হাত ধরে ফেলল। তার শক্ত আঙুল শৈলীর কুঁচকে থাকা চুড়ির ওপরে চেপে বসলো। গভীর চোখে তাকিয়ে কঠিন স্বরে ছোট করে আদেশ ছুঁড়ে বলল, "চল...! " বলেই নিশান আর এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে শৈলীকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলো বসার ঘরে। শৈলী হোঁচট খেতে খেতে নিজেকে সামলে নিল। কিন্তু কার চোখ নিশানের শক্ত হাতের মুঠোয় থাকা নিজের হাতের দিকে। শৈলীর নিঃশ্বাস আটকে আসছে। নিশানের শক্ত মুঠোয় তার হাত অসহায়ের মতো বন্দি হয়ে আছে, আর সে জানে, এই মুহূর্তে কোনো প্রতিবাদ করলেও লাভ হবে না। নিশান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ~~~ বসার ঘরে ঢুকতেই শৈলীর বুক ধক করে উঠল। বড় মা সোফায় বসে আছেন, পাশে কয়েকজন আত্মীয়স্বজনও আছেন। তাদের সামনে এভাবে টেনে আনা, নিশান আসলে কী করতে চাইছে? খাদিজা তালুকদারের কপালে ভাঁজ পড়ল। এমনিতেই হঠাৎ করে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাত্রপক্ষের চলে যাওয়া নিয়ে তিনি বিরক্ত। কারণ তিনি জানেন তার একমাত্র ছেলে এই পাত্রপক্ষকে বিদায় করেছে। নিজের ভালোবাসা ছেলের ওপরও তিনি রাগ দেখাতে পারেন না বলেই চুপ হয়ে গেছেন। কিন্তু এখন আবার শৈলীর হাত ধরে টেনে সবার সামনে আনতে দেখে খাদিজা ভ্রু কুঁচকে বললেন, " এভাবে ওকে টেনে আনছিস কেন, নিশান?" নিশান শৈলীর হাত ছেড়ে দিয়ে দু’হাত বুকের কাছে বাঁধল, কঠোর কণ্ঠে বলল, " একটা কথা জানার খুব ইচ্ছা করছে, মা। শৈলীর পা তুমি কেনো পুড়িয়ে দিয়েছ?" এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আত্মীয়দের মুখে বিস্ময়, আর খাদিজা তালুকদারের চোখ রাগে চকচক করতে লাগল। এভাবে সবার সামনে যে তার ছেলে এই কথাটা উঠাবে তিনি ভাবতেই পারেননি। মেকি হেসে ঠোঁট চেপে খাদিজা বললেন, " এসব কী বলছিস তুই, নিশান? এসব কথা কোথা থেকে শুনলি? কখনোই না।" বলেই তিনি শৈলীকে ইশারায় ভয় দেখালেন। শৈলী আতঙ্কে নিশানের দিকে তাকাল, " নিশান ভাই, প্লিজ..." কিন্তু নিশান একটুও থামল না। " আমি নিজে দেখেছি, মা। শৈলীর পায়ে ছ্যাঁকার দাগ। এই বাড়ির কেউ না জানুক, আমি জানি, এটা কিভাবে হয়েছে। আমি তো চুপ করে থাকব না। আফটার অল, আমি তোমরাই ছেলে।" খাদিজা তালুকদার এবার দাঁড়িয়ে গেলেন, " তোর কি ধারণা, তুই আমার বিচার করবি? শৈলী আমারই সংসারে থাকে, আমার কথাই শুনবে।" নিশান এবার ঠোঁট ভিজিয়ে বলতে থাকলো, " প্রথমত আমি তোমাকে বলেছিলাম এখন শৈলীর বিয়ে না দিতে, অথচ তুমি আমাকে না জানিয়ে লুকিয়ে পাত্রপক্ষ বাড়িতে এনেছিলে। এখনো শৈলীর এইচ এস সির রেজাল্ট দেয়নি। ওকে ভার্সিটিতে পড়ানোর স্বপ্ন আছে বাবার। এই বয়সে তুমি কেনো বিয়ে দিতে চাচ্ছো ওকে? আমি তো মানা করেছি। তুমি ইচ্ছে করে আমার অনুপস্থিতিতে এভাবে দুবার ওকে পাত্র পক্ষের সামনে বসিয়েছো। আজ বাবা, মামনি আর আমি ছিলাম না দেখেই তুমি এই কাজটা করলে। এটা কি ঠিক হলো মা? আমি তো তোমাকে আগেও বলেছিলাম সময় আসলে ওর বিয়ে হবে।" খাদিজা তালুকদারের মুখে একটা কঠিন রাগের ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু তিনি ধৈর্য হারালেন না। ঠোঁটের কোণে হালকা বিদ্রুপের হাসি টেনে বললেন, "তুই তো অনেক কিছু বলিস, নিশান। কিন্তু আমি জানি, কার জন্য এত উতলা হয়ে আছিস। আমার কথা শোন বাবা। এই মেয়েকে আমি আর চালাতে পারবো না। ওর বাপ মরার মত বাড়ির এক কোনায় পড়ে আছে। মা টাকে তো আগেই মেরে ফেলেছে। এখন এই মেয়েকে চালানোর দায়িত্ব মোটেই আমাদের নয়। হ্যাঁ, হতে পারে ওর সাথে আমাদের রক্তের সম্পর্ক আছে। কিন্তু তাই বলে এই নয় যে আমি আমার টাকায় ওকে খাওয়াবো, পড়াবো।" নিশান বাঁকা হেসে বলল, " মা, একটু ভুল হলো। শৈলী মোটেই তোমার টাকায় চলে না। ও বাবার টাকায় চলে আর। এ বাড়িতে আমাদের যেমন অধিকার আছে ওরও তেমনি অধিকার আছে। তুমি ছোট আব্বুকে নিয়ে কথা বলছো তাইতো? ভুলে যেওনা, এই বাড়িটা ছোট আব্বুর নামেই আছে। সেই হিসেবে শৈলীর পুরো অধিকার আছে এই বাড়িতে থাকার। তুমি ইচ্ছে করে ওকে এভাবে বাড়ি থেকে বিদায় করতে পারো না। ও প্রথম থেকেই তোমার টাকায় চলে না। " খাদিজা তালুকদার মুখ কুঁচকালেন। না জানি তার ছেলের মাথায় কে এসব ঢুকিয়েছে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শৈলীর দিকে চলে গেল। শৈলী এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, এখনো মাথা নিচু। নিশানের হাতটা আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু পারল না। নিশান এবার একধাপ সামনে এগিয়ে গিয়ে কড়া গলায় বলল, "মা, ওর জীবন নিয়ে তুমি এভাবে খেলতে পারো না।" খাদিজা তালুকদার এবার মুখ শক্ত করে ফেললেন। " তুই যদি এতই দায়িত্ববান হোস, তাহলে নিজের সংসার করে নে, শৈলীর জন্য এত ভাবতে হবে না।" শৈলী এবার চোখ তুলে তাকাল নিশানের দিকে। নিশান কি... সত্যিই কিছু করবে? নিশান গভীর নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর অনেকটাই ধীর গলায় বলল, "সংসার? আমার নিজের সংসার করতে বলছো মা? তুমি কি সত্যিই জানো আমি কী চাই?" খাদিজা তালুকদার এবার একটু থমকে গেলেন। নিশানের গলার স্বরে যে দৃঢ়তা, সেটা অচেনা নয়। নিশান এবার নিঃশ্বাস ফেলল, চোখে একধরনের অস্বাভাবিক প্রশান্তি ফুটে উঠল, যেন সে ঠিক এটাই আশা করেছিল। তারপর একদম ঠান্ডা গলায় বলল, " শৈলী আর এই বাড়িতে থাকবে না, মা।"
