দুষ্ট হৃদিতা ও রুদ্র স্যার পর্ব ১

Story - I Love You

"I Love You"

"আই লাভ ইউ" – মেসেজটা দিয়েই স্যারকে ব্লক করে দিলাম। এরপর? এরপর দুই বোন মিলে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছি! যেন বিশাল কোনো যুদ্ধ জিতে এসেছি!

কোনো মতে হাসির বিরতি টেনে এবার গবেষণা শুরু করলাম— রুদ্র স্যার এখন কী ভাবছেন? তার রিঅ্যাকশন কেমন হবে? বিরক্ত হবে? রাগ করবে? নাকি কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই বুঝে যাবে, এটা একটা ফাঁদ?

আমি অনামিকা চৌধুরী হৃদিতা। আর আমার এই দুষ্টুমিতে যে তাল মিলিয়ে হাসছে, সে আমার ছোট বোন সৃষ্টি চৌধুরী।

আমি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী, আর সৃষ্টি এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। আমাদের দু’জনের স্বভাবই প্রায় এক! তবে সৃষ্টি শান্তশিষ্ট, আর আমি একটু দুষ্টু আর চালাক!

আমার একটা নাম আছে, কিন্তু আমার চেয়ে বেশি পরিচিতি আছে আমার উপাধি দিয়ে।

মায়ের কাছে: আমি মানেই একটা যন্ত্রণা! পাড়ার ছেলেদের কাছে: আমি মানেই আতঙ্ক! পাড়ার আন্টিদের কাছে: আমি একটা বাঁদর মেয়ে!


(একেক জনের কাছে একেক রকম খেতাব! আর এই খেতাবগুলো অর্জন করতে আমাকে কম পরিশ্রম করতে হয়নি! আমার মতো মেয়ে সচরাচর দেখা যায় না! মানে, যেখানে অন্য মেয়েরা চুপচাপ ক্লাসে গিয়ে বসে, আমি সেখানে ঢুকেই হইচই লাগিয়ে দেই! পাড়ার আন্টিরা যখন আড্ডা দিতে বসেন, আমি ঠিক তখনই পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, যেন ওদের গল্পের মূল টপিক হয়ে উঠতে পারি। আর ছেলেরা? আমাকে দেখলেই রাস্তা বদলে ফেলে! কারণ, আমি এমন একজন, যে পঁচানি দিতে এক মুহূর্তও দেরি করে না! কিন্তু আজকে আমার মিশন ছিল একটু অন্যরকম! রুদ্র স্যারকে একেবারে মেজাজ খারাপ করিয়ে দেওয়া! রুদ্র শিকদার, আমাদের নতুন ইংরেজি টিচার! বাবার বন্ধুর ছেলে,আমার বাঁদরামি জন্য একটা স্যার ও টিকতে পারে নাই আর বাবা এনাকে ঠিক করলো তাই তার কাছেই পড়তে বাধ্য হয়েছি। যদিও সে প্রথমে রাজি হয়নি, কিন্তু বাবার কারণে শেষমেশ রাজি হতে বাধ্য হয়েছে। আর আমি?

আমি চাই না এই কঠিন, গম্ভীর স্যারকে আমার টিচার হিসেবে পেতে! (বি দ্রঃ স্যারকে আমি দেখি নাই কিন্তু ফ্রেন্ডদের কাছে শুনলাম স্যার নাকি গম্ভীর আর রাগী তাতে আমার কি আমার তো এবার কাছে পড়ার ইচ্ছাই নেই তাই সৃষ্টি দিয়ে আব্বুর মোবাইল থেকে স্যার এর নাম্বার বের করে এই মিশন এ নেমে পড়লাম ) তাই আজ সকাল থেকেই নতুন প্ল্যান— স্যারকে এমন কিছু করব, যাতে সে নিজেই পড়াতে আসবার আগেই পড়ানো ছেড়ে দেয়! আর সেই প্ল্যানের প্রথম ধাপ ছিল এই "আই লাভ ইউ" মেসেজ!

আমি আর সৃষ্টি মিলে হাসতে হাসতে বেঁচে থাকলাম না! "হৃদিতা, তুই তো আস্ত একটা ক্রিমিনাল!"— সৃষ্টি খিলখিল করে হেসে বলল। "দেখি তো, স্যার কিছু রিপ্লাই দেয় নাকি!" আমি বললাম, যদিও জানি, ব্লক করার পর উত্তর পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে মায়ের চিৎকার— "হৃদিতা! পড়তে বসবি না? আজ আবার স্যারের কাছে ক্লাস আছে!" মায়ের ডাক শুনেই আমার মুখ থেকে হাসি উধাও! ওহ নাহ! আজই তো রুদ্র শিকদারের প্রথম ক্লাস!

আমি তো স্যারকে ব্লক করেই রেখেছি! উনি কি তাহলে সরাসরি ফোন করে বসবেন? নাকি বাবাকে কিছু বলে দেবেন? যদি বলে দেয়, তাহলে তো সর্বনাশ! আমার বেঁচে থাকার সব রাস্তা বন্ধ! সৃষ্টি মুখ চেপে হাসছে। "আপুরে, স্যার যদি এখন ফোন করে, কী বলবি?" আমি চুল টেনে ধরলাম। "তোর জন্যই তো আজ এই বিপদে পড়লাম! তোর মাথাতেই প্রথম এই প্ল্যান এসেছিল!" সৃষ্টি গাল ফুলিয়ে বলল, "আপু, তুই যা বলিস, আমি তো সেটাই করি! এখন তো নিজেই ফাঁদে পড়েছিস!" আমি কিছু বলার আগেই দরজার ওপাশ থেকে বাবা বলে উঠলেন, "হৃদিতা, পাঁচ মিনিটের মধ্যে পড়ার ঘরে চলে আয়। স্যারকে ফোন দিয়েছিলাম, উনি এসে গেছেন!" আমার চোখ বড় হয়ে গেল! স্যার এসে গেছেন?! সৃষ্টি মুখেও আতঙ্ক! "আপু, তুই কি বেঁচে আছিস?" আমি আস্তে করে বললাম, "আজকে তো মনে হয় জান কবচ হয়ে যাবে!" তবুও সাহস সঞ্চয় করে কোনো মতে উঠে পড়লাম। মনে মনে প্ল্যান করলাম— যা-ই হোক না কেন, আমি কিন্তু পড়ব না! আজকে রুদ্র শিকদার নিজেই আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে! ---

রুদ্র শিকদারের সঙ্গে প্রথম দেখা আমি পড়ার ঘরে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়ল বাবাকে। উনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। আর তার সামনেই বসে আছেন… আমার নতুন শিক্ষক তিনি আমাদের কলেজ এর নাকি নতুন শিক্ষক বাট জানি না আমি কারণ আমি অসুস্থ থাকায় যেতে পারি নাই আমার বান্ধবী নিলা বলেছিল ! রুদ্র শিকদার! আমি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এটা কি মানুষ নাকি পাথরের মূর্তি?! ছয় ফুট লম্বা, চওড়া কাঁধ, ফর্সা গায়ের রঙ। চোখেমুখে কোনো ভাব নেই, একদম সিরিয়াস লুক! যেন এই লোকটার জীবনে কোনো হাসি নেই! তার চোখ আমার দিকে ঘুরতেই আমি কিছুটা পিছিয়ে এলাম। বাবা বললেন, "স্যার, এই হলো আমার মেয়ে অনামিকা চৌধুরী হৃদিতা। একটু দুষ্টু, কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগী হলে ভালো করবে। আপনাকে কষ্ট দিলাম!" রুদ্র স্যার গম্ভীর গলায় বললেন, "দুষ্টুমি আমার পছন্দ না, আমি শৃঙ্খলা মেনে চলি। আপনার মেয়ে যদি নিয়মিত না পড়ে, তাহলে আমি পড়াব না।" আমার ভেতরে আতঙ্কের ঘণ্টা বেজে উঠল! এই লোকটা তো মারাত্মক রাগী! এত সিরিয়াস কেউ হয় নাকি? আমি জোর করে হাসলাম। "স্যার, আমি কিন্তু খুব ভালো স্টুডেন্ট!" স্যার একদম সোজা তাকিয়ে বললেন, "তাহলে ‘আই লাভ ইউ’ কেন পাঠালে?" (বি দ্রঃ মহির আব্বু জানতো তার মেয়ে এমন কিছু করবে তাই হৃদিতার নাম্বার রুদ্রকে দিয়ে রাখছিল তাই রুদ্রের বুঝতে দেরি হয় নাই যে এই ফাজলামোটা হৃদিতা করছে)

আমি থ! মাথার ভেতর তখন একটাই কথা— "আমি আজ সত্যিই শেষ!" রুদ্র শিকদারের কথায় আমার শরীর থেকে যেন সব রক্ত সরে গেল! এই লোকটা কেমন? এভাবে সামনে বলল? বাবা যদি শুনে ফেলে? আমি দ্রুত বাবার দিকে তাকালাম। ভাগ্য ভালো, বাবা তখনই ফোনে কথা বলতে বলতে বাইরে চলে গেলেন! সৃষ্টি দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল। আমার দিকে তাকিয়ে সে মুখ চেপে হাসছে। ওর হাসি দেখে আমি আরও রেগে গেলাম! আমি কাশির অভিনয় করলাম। "স্যার, আপনি কিছু ভুল বুঝেছেন। আমি তো আপনাকে কোনো মেসেজ পাঠাইনি!" রুদ্র স্যারের ভ্রু সামান্য কুঁচকালো। "তাহলে কে পাঠিয়েছে?" আমি ভেতরে ভেতরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম— "আমার তো মনে হচ্ছিল এই লোকটা কোনো দিন কথা বলে না! কিন্তু আজ প্রথম দিনেই এমন কঠিন প্রশ্ন!" আমি ঠোঁট কামড়ে বললাম, "স্যার, মনে হয় এটা কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।" রুদ্র স্যার ঠান্ডা গলায় বললেন, "ভুল বোঝাবুঝি? তোমার নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে, আবার তুমি বলছ ভুল?" আমি এবার সত্যি বিপদে পড়েছি! বুদ্ধি খুঁজতে লাগলাম। এরপর অভিনয়ের ঢঙে বললাম, "আসলে স্যার, সেটা তো আমি পাঠাইনি! সৃষ্টি পাঠিয়েছে! ও আমার ফোন নিয়ে খেলে, হয়তো ভুল করে কিছু পাঠিয়েছে!" সৃষ্টি দরজার ওপাশ থেকে চমকে উঠল। "আপু, এটা কী করলি?" রুদ্র স্যার আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, "তাহলে সৃষ্টিকে ডাকো। ওর কাছ থেকে শুনতে চাই।" আমি দ্রুত বললাম, "ও এখন ওযু করতে গেছে!" স্যার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরপর বইয়ের পাতা উল্টে বললেন, "যাই হোক, ক্লাস শুরু করা যাক।" আমি মনে মনে শান্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বেঁচে গেলাম! কিন্তু তখনই স্যারের পরের কথা শুনে আমার শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল! "তুমি যেহেতু ইংরেজি ভালো জানো, তাহলে আজকের ক্লাস তুমি আমাকে পড়াবে!" আমি চেয়ারে বসার আগেই দাঁড়িয়ে গেলাম। "কি?! আমি আপনাকে পড়াব?" স্যার ঠান্ডা গলায় বললেন, "হ্যাঁ, তুমি তো বললে তুমি ভালো স্টুডেন্ট! তাহলে আমাকে একটা গ্রামার চ্যাপ্টার বোঝাও। না হলে ধরে নেব, তুমি শুধু দুষ্টুমি করতেই জানো, পড়তে নয়।" আমার মাথার ওপর বাজ পড়ল!

এখন কি করব? আমি কি জানতাম, আমারই বানানো ফাঁদে আমি নিজেই পড়ে যাব? আমি টের পেলাম, রুদ্র স্যার শান্ত গলায় বসে থাকলেও তার চোখ দুটো কেমন যেন ভয়ংকর হয়ে আছে! যেন আমার প্রতিটা নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে! আমি চোখ ছোট করে ভাবতে লাগলাম— "এই লোক কি মানুষ? নাকি ইন্টারনালের সেই ভয়ানক শিক্ষক, যে শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিয়ে মজা পায়?" স্যার আবারও বললেন, "কী হলো? এতক্ষণ তো খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলে! এবার বোঝাও আমাকে গ্রামার চ্যাপ্টার!" আমি কাশির ভান করলাম, "স্যার, আমি আসলে আজ একটু অসুস্থ।" স্যার ঠান্ডা গলায় বললেন, "তাহলে চুপচাপ বোসো। তোমার অসুস্থতার জন্য আমি তো ক্লাস বন্ধ করতে পারি না।" আমি মুখ বিকৃত করলাম, কিন্তু কিছু বলার সাহস পেলাম না। সৃষ্টি দরজার ওপাশ থেকে হাসি চেপে দেখছিল। আমি মনে মনে শপথ করলাম, "বোনের ওপর প্রতিশোধ নিতেই হবে!" স্যার বই খুলে পড়ানো শুরু করলেন। আমি একদম একটা মূর্তির মতো চুপচাপ বসে আছি। কিন্তু পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই আমি হাঁপিয়ে উঠলাম! এত সিরিয়াস ক্লাস আমি আগে কখনোই করিনি! এই লোক একদম রোবটের মতো!" আমি আস্তে আস্তে টেবিলের নিচে ফোন বের করলাম। ভাবলাম একটু ফেসবুক চেক করি, সময় কেটে যাবে।

কিন্ত ঠিক তখনই স্যারের কড়া গলা— অনামিকা চৌধুরী হৃদিতা! টেবিলের নিচে কী করছো?" আমি তাড়াতাড়ি হাতটা পেছনে নিয়ে মুখে সরল একটা হাসি ফুটিয়ে তুললাম। "কিছু না স্যার!" স্যার ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বললেন, "তোমার হাতে কী আছে, দেখাও।" আমি মনে মনে কাঁদলাম! এই লোক তো একদম স্পাইয়ের মতো! আমি আস্তে করে ফোনটা টেবিলের ওপরে রাখলাম। স্যার ফোনটা নিয়ে বললেন, "তুমি ক্লাসে ফোন ইউজ করো?" আমি মাথা নিচু করে বললাম, "স্যার, শুধু একটু... মানে সময় দেখতে চেয়েছিলাম।" স্যার ঠান্ডা গলায় বললেন, "ঠিক আছে, তাহলে এই ফোনটা ক্লাস শেষ হলে ফেরত পাবে!" আমার মুখ হা হয়ে গেল! "মানে? আমার ফোন কবে থেকে বাজেয়াপ্ত হতে লাগল?" কিন্তু স্যার কোনো কথাই শুনলেন না! আমার ফোনটা রেখে দিলেন টেবিলের ওপর, তারপর শান্ত গলায় পড়ানো শুরু করলেন! আমি মনে মনে চিৎকার করে উঠলাম— "রুদ্র সিকদার ! তোমাকে আমি পেয়েছি ,এবার দেখো, আমি কী করি!")

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url